আতাউল্লাহ নাবহান মামদুহ >>
রাজধানীতে ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা সংক্রান্ত ঘোষণার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও আপাতত সেই ঘোষণার বাইরে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তবে দলটি বলছে, সমঝোতা বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং বহুমাত্রিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো এক লিখিত বার্তায় বলা হয়, “সমঝোতার বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয় নাই। বহুমাত্রিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের ‘এক বাক্স নীতি’র ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক সমঝোতার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা জাতির মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। তবে কিছু জটিলতা তৈরি হলেও এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবেই জাতিকে অবহিত করবে।
প্রেস ব্রিফিং ডেকেছে ইসলামী আন্দোলন
এদিকে নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকাল ৩টায় প্রেস ব্রিফিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
দলটির পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়—
স্থান: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ৫৫/বি পুরানা পল্টন (৩য় তলা), ঢাকা।
এই ব্রিফিংয়ে নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে দলটির বিস্তারিত অবস্থান তুলে ধরা হবে।
১১ দলে নেই কেন ইসলামী আন্দোলন
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে— কেন ইসলামপন্থী এই বড় দলটি ১১ দলীয় জোটের ঘোষণার বাইরে রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ব্যক্তিরা এর পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল সংকট তৈরি হয়েছে আসন বণ্টনের ন্যায়সংগততা ও সম্ভাবনাময় আসন ছাড়ের প্রশ্নে।
রোকন রাইয়ান নামের এক বিশ্লেষক বলেন, ইসলামী আন্দোলনকে জামায়াত এমন সব আসনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশেই জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা নেই। অথচ ইসলামী আন্দোলনের যেসব আসনে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনপ্রিয় প্রার্থী রয়েছে, সেসব আসন জামায়াত ছাড়েনি।
ঢাকা-৫ আসনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাজি ইব্রাহিম খলিল দুইবারের নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার হলেও তাকে আসন ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং তুলনামূলক অপরিচিত প্রার্থীকে রাখা হয়েছে উন্মুক্তের নামে।
একইভাবে ঢাকা-১১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ মাওলানা ফজলে বারী মাসউদের আসন কোনো আলোচনা ছাড়াই অন্য দলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
‘ভোট নেব, কিন্তু জিততে দেব না’— এমন অভিযোগ
বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মতে, ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগের মূল কথা হলো—“আপনাদের ভোট আমরা নেব, কিন্তু এমন আসন দেব যেখানে জয়ের সুযোগ থাকবে না।”
সাংবাদিক পলাশ রহমান একে ‘এক বাক্স নীতি হাইজ্যাক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জামায়াত আসন বণ্টনে এনসিপি, মামুনুল হকের দল ও অন্যান্য ছোট দলকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দিয়েছে, অথচ ইসলামী আন্দোলনকে কম সম্ভাবনাময় ও উন্মুক্ত আসনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলনের জন্য যে ৪০–৪৫টি আসনের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যেও অনেকগুলো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যেখানে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লা—উভয় মার্কার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এতে ইসলামী আন্দোলনের একক আসন সংখ্যা নেমে আসতে পারে ৩০-এর নিচে।
তিনি অভিযোগ করেন, এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো ইসলামী আন্দোলনকে তৃতীয় সারিতে নামিয়ে এনে এনসিপিকে দ্বিতীয় প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
আলোচনার বাইরে সিদ্ধান্ত ও সময়ক্ষেপণের অভিযোগ
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, জামায়াত কারো সঙ্গে আলোচনা না করে একাধিক দলকে সমঝোতায় যুক্ত করেছে। দিনের পর দিন আসন বণ্টন সংক্রান্ত বৈঠক ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, বারবার বৈঠকের সময় নির্ধারণ করে তা বাতিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও জামায়াত পক্ষ থেকে সেগুলোর স্পষ্ট অস্বীকৃতি আসেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
মাঠপর্যায়ের অভিযোগও সামনে
মাঠপর্যায় থেকেও অভিযোগ উঠছে। নরসিংদীর রায়পুরা-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী বদরুজ্জামানের বিপরীতে জামায়াতের বহিষ্কৃত এক নেতার পক্ষে গোপনে কাজ করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে জোটের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এখনো চূড়ান্ত নয়
তবে এসব অভিযোগ ও সমালোচনার মধ্যেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বলছে— তারা এখনো আলোচনার টেবিল ছাড়েনি। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এখনো ‘তরল’ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং ও পরবর্তী আলোচনার মাধ্যমে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের প্রেস ব্রিফিং এবং তার পরবর্তী অবস্থানই নির্ধারণ করবে— ইসলামপন্থী রাজনীতিতে ঐক্য কোন পথে যাচ্ছে।
হাআমা/
