২০১৬ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুরে কথিত ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাতজনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই নির্দেশ প্রদান করেন।
ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত গণহত্যার অন্য একটি মামলায় তিনি আগে থেকেই কারান্তরীণ ও গ্রেপ্তার ছিলেন। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ২০১৬ সালের গাজীপুরের ওই ঘটনাকে সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়।
আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আছাদুজ্জামান মিয়াকে গাজীপুর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি বিশেষ অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করেছিল যে, সেখানে একটি জঙ্গি আস্তানায় বন্দুকযুদ্ধে সাতজন নিহত হয়েছেন। তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে জঙ্গিবিরোধী সফল অভিযান হিসেবে প্রচার করা হলেও, সাম্প্রতিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, সেটি ছিল একটি সাজানো নাটক। নিহত সাতজনকে আগেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে জয়দেবপুরে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার সঙ্গে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ তদন্ত সংস্থার হাতে এসেছে বলে জানা গেছে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল বিগত দেড় দশকের আমলের বিভিন্ন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত করছে। আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে ডিএমপি কমিশনার থাকাকালীন একাধিক ‘ক্রসফায়ার’ ও গুমের ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। জয়দেবপুরের সাতজন হত্যার ঘটনাটি ট্রাইব্যুনালের তদন্তাধীন অন্যতম একটি বড় মামলা।
প্রসিকিউশন বলছে, তৎকালীন সরকারের সময় বিরোধী মত দমনে পুলিশ বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং ‘জঙ্গি দমনের’ নাম দিয়ে যেভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার দায় তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের এড়ানোর সুযোগ নেই।
আছাদুজ্জামান মিয়ার মতো একজন প্রভাবশালী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোয় পুলিশ প্রশাসনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, জয়দেবপুরের মতো সাজানো অভিযানের সত্যতা উন্মোচিত হলে তা বাংলাদেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসে এক বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।Politics
অন্যদিকে, আসামী পক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছেন যে, আছাদুজ্জামান মিয়া কেবল সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জঙ্গি দমনের অভিযানে তার ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ ছিল না। তবে আদালত মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিনে প্রসিকিউশন এই মামলা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত নথিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি উপস্থাপন করতে পারে। গাজীপুরের এই সাত হত্যা মামলার তদন্তে আরও অনেক পুলিশ কর্মকর্তার নাম আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের পর দেশে ইনসাফ কায়েমের যে দাবি উঠেছে, তারই ধারাবাহিকতায় এই বিচার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে দেশের সচেতন মহল।
হাআমা/
