৩৬ নিউজ ডেস্ক : মনোহর দিঘি মসজিদ সত্যিই ইলমি বাগানের স্পর্শে মনোরম ছিল। কালের আবর্তে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। আজ মসজিদগুলোতে হারিয়ে গেছে মকতবও। ঝিনাইদহ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মনোহর দিঘি মসজিদ। এটি জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। মসজিদটি উপজেলার বারোবাজার প্রত্নস্থলে অবস্থিত। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত মসজিদটি এখন আর অক্ষত নেই, বরং তা এখন ধ্বংসাবশেষ।
বলা যায় মসজিদের বেশির ভাগ অংশই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মসজিদের যে অংশ টিকে আছে তা তার গৌরবময় অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনোহর দিঘি মসজিদ নিছক কোনো মসজিদ ছিল না, এখানে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাঠদানও করা হতো। অর্থাৎ মসজিদটি একই সঙ্গে মসজিদ ও মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এমনকি সেখানে ছিল নারীদের ইবাদত ও নামাজের স্থান।
১৯৯২-৯৩ সালে বাংলাদেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বারোবাজার প্রত্নস্থলে খননকার্য পরিচালনা করে। তখন তারা মনোহর ঢিবি নামের এক স্থানের সন্ধান পান। ঢিবি খননের পর সেখানে একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়।
মসজিদটি যেখানে আবিষ্কৃত হয় তার পাশে আছে একটি দিঘি, যা স্থানীয়দের কাছে মনোহর দিঘি নামে পরিচিত। মনোহর দিঘির সঙ্গে মিলিয়ে মসজিদের নাম রাখা হয় মনোহর দিঘি মসজিদ। খননের পর থেকে মনোহর দিঘি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত।
খননের ফলে আবিষ্কৃত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দেখে অনুমান হয় যে মসজিদটি ছিল ৩৫ গম্বুজবিশিষ্ট। মনোহর মসজিদটি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে লম্বাভাবে নির্মিত। এর অভ্যন্তর ভাগ উত্তর-দক্ষিণে আয়তন ২২.৬৭ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৬.১০ ফুট। মসজিদের দেয়ালগুলোর পুরুত্ব প্রায় পাঁচ ফুট। মসজিদের মিনারগুলো নির্মাণে ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রতিটি সারিতে চারটি করে স্তম্ভ আছে। মোট স্তম্ভের সংখ্যা ২৪টি।
মসজিদে বর্তমানে কোনো গম্বুজ নেই। মসজিদের কাঠামো দেখে অনুমান হয় এতে চারটি মিনার ছিল। যদিও খননের ফলে দুটি মিনারের পাঁচ ফুট পরিমাণ ধ্বংস হয়ে গেছে। মসজিদের চার কোনায় চারটি গোলাকার বুরুজ ছিল। উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব কোনার বুরুজ দুটি বিদ্যমান অক্ষত আছে।
মসজিদের অভ্যন্তরে আয়তাকার চারটি প্ল্যাটফর্ম দেখা যায়। এগুলো পাঠদান কাজে ব্যবহৃত হতো। আরবিতে দিক্কাতুল মুবাল্লিগ বলা হয়। এটা হলো মসজিদের মেঝে থেকে একটু উঁচু বেদি বা মঞ্চ, শিক্ষক সেখানে বসে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেন। আবার জনসমাগম বেশি হলে এমন মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে মুকাব্বির অন্যের কাছে মুয়াজ্জিনের শব্দ পৌঁছে দিতেন।
প্ল্যাটফর্মগুলো মসজিদটি মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সাক্ষ্য দেয়। মসজিদের বাইরের দিকে উত্তর-পশ্চিম কোনায় একটি কক্ষ দেখা যায়, যেটি ইমামের বসবাসের জন্য ব্যবহার করা হতো। হজরত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোনায় অনুরূপ কামরার দেখা মেলে। হতে পারে মসজিদের ইমাম একই সঙ্গে ইমাম ও মাদরাসার আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। হয়তো দ্বিনি শিক্ষার প্রাচীন পদ্ধতি অনুসারে তার কাছেই বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ গ্রহণ করতে শিক্ষার্থীরা সমবেত হতো।
প্রাচীন এই মসজিদের একটি বিস্ময়কর দিক হলো- এখানে নারীদের ইবাদত ও নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল, যা বাংলার প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে খুবই বিরল। মসজিদের অভ্যন্তরে উত্তর-পশ্চিম কোনায় নারীদের ইবাদত ও নামাজ আদায়ের কক্ষ ছিল। নারীদের জন্য পৃথক অবস্থানস্থল থাকায় এই প্রশ্নও মনে জাগে মসজিদভিত্তিক এই মাদরাসায় কি পুরুষ শিক্ষার্থীদের মতো নারী শিক্ষার্থীরাও ধর্মীয় জ্ঞান আহরণের সুযোগ পেত? সে ইতিহাস এখনও সুস্পষ্ট নয়, তবে কোনো একদিন হয়তো তা মানুষের সামনে প্রকাশ পাবে।
