২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৫৬টি মামলা হয়। এর মধ্যে মাত্র ২১৫টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। এখনও ১ হাজার ৬৪১টি মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি। এসব মামলার তদন্ত কাজ দ্রুত শেষ বা নিষ্পত্তি করতে তদন্ত কর্মকর্তারা ৮ ধরনের চ্যালেঞ্জ বা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব চ্যালেঞ্জ বা বাধা কাটিয়ে মামলার তদন্ত শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় গত ১৬ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৫৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৫৭টি মামলা হয়েছে দেশের বিভিন্ন থানায়। এর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা এবং ১২৬টি অন্যান্য ধারার মামলাসহ ১৭৫টি মামলা তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এ হিসাবে ১ হাজার ৮৫৬টি মামলার মধ্যে তদন্ত নিষ্পত্তি করা হয়েছে মোট ২১৫টি মামলা। এখনও ১ হাজার ৬৪১টি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এসব মামলার তদন্ত ঝুলে আছে।
চার্জশিট দেওয়া ১৭৫টি মামলায় মোট আসামি ১৩ হাজার ৮২৪ জন। এর মধ্যে এজহারনামীয় আসামি ৯ হাজার ৪৪৫ জন। তদন্তে পাওয়া আসামির সংখ্যা ৪ হাজার ৩৭৯ জন। ৪৯টি হত্যা মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৩ জন। এর মধ্যে এজহারনামীয় ৩ হাজার ২৭১ জন এবং তদন্তে প্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ১ হাজার ৪৫২ জন।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলার আসামিদের নাম ঠিকানা যাচাই করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। একেকটি মামলায় একশ থেকে শুরু করে তিনশ জন পর্যন্ত আসামি। কোনো কোনো মামলায় এরচেয়েও বেশি আসামি। তাদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা যাচাই করতে অনুসন্ধান স্লিপ পাঠান তদন্ত কর্মকর্তারা। সেই প্রতিবেদন আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
মামলা সংক্রান্ত অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লিংকের ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া ভিকটিমের মৃত্যুকালীন ও জীবিতকালীন ছবিসহ যাচাই করতে বিলম্ব হয়ে থাকে। হতাহতের ঘটনায় জব্দকৃত গুলির ব্যালস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন আসতেও দীর্ঘ সময় লাগছে।
জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের মেডিক্যাল সনদ পেতে বিলম্ব হচ্ছে। যারা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সেই মেডিক্যাল সনদ সঠিক সময়ে পাচ্ছেন না তদন্ত কর্মকর্তারা। এ ছাড়া যেসব সরকারি হাসপাতালে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ময়নাতদন্ত হয়েছে, সেসব হাসপাতালে দফায় দফায় চিঠি দিয়েও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন মিলছে না। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে এই প্রতিবেদন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকালে যেসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সেসব জায়গায় ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন কোন সদস্য মোতায়েন ছিল সে তথ্য পেতে বিলম্ব হচ্ছে। বাহিনীগুলোয় বার বার চিঠি দিয়েও সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না তদন্তকারীরা। বিশেষ করে পুলিশের বাইরে যারা মোতায়েন ছিলেন তাদের তথ্য। একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ঘটনার দায়দায়িত্ব নির্ধারণে এ তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। বাহিনী মোতায়েনের সঠিক তথ্য বিশেষ করে কার বা কাদের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে তাদের নাম পরিচয় পেতে বিলম্ব হওয়ায় মামলা নিষ্পত্তি করতে পারছেন না তদন্ত কর্মকর্তারা।
মামলার বর্ণিত আসামিদের ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার এবং কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) পেতেও বিলম্বের কারণে তদন্ত আটকে যাচ্ছে। মামলায় বর্ণিত ঘটনার সময় আসামির অবস্থান কোথায় ছিল এটা জানতে চান তদন্ত কর্মকর্তারা। কিন্তু মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে এই তথ্য পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে তদন্ত আটকে থাকছে।
এজাহারে ঘটনাস্থলের ভুল বর্ণনা থাকা এবং মামলায় ঢালাও আসামি থাকার ঘটনাও তদন্ত কর্মকর্তাদের গলদঘর্ম করছে। তদন্তও জটিল করে তুলছে। কারণ যেকোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনাস্থল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নানাভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনাস্থল বের করতেও সময় লাগছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যেসব মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে, সেসব লাশের ময়নাতদন্ত করতে কবর থেকে লাশ উত্তোলনে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক ভিকটিমের স্বজনরা লাশ উত্তোলনে বাধা দিচ্ছেন বা উত্তোলন করতে চান নাÑ সেক্ষেত্রেও তদন্ত ঝুলে যাচ্ছে।
যেসব মামলায় চাকরিতে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আসামি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আগে সরকারের পূর্বানুমতি লাগছে। এই অনুমতি নিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতেও তদন্ত কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে বলে একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলা। এসব মামলা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিবিড় তদন্ত করতে হচ্ছে। এ ছাড়া এসব মামলায় যাতে কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি না থাকে তা তদারকিতে মেন্টর কমিটি কাজ করছে। বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও মামলাগুলোর তদন্ত কাজ তদারকি করা হচ্ছে। এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে কিছুটা সময় লাগছে। এ ছাড়া সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহেও সময় লাগছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার হোসেন মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন (২০) বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় তার মা তাছলিমা বেগম বাদী হয়ে গত ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। যেখানে আসামি করা হয় মোট ১৩১ জনকে। বাদী মামলার ঘটনাস্থল উল্লেখ করেন যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার সামনে। তবে তদন্তে ঘটনাস্থল ভিন্নতা পান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই সঞ্জয় সরকার। আসামিদের নাম ঠিকানা এজাহারে সম্পূর্ণভাবে দেওয়া হয়নি। ভিকটিমের মরদেহ ময়নাতদন্তও করা হয়নি। সুরতহালও হয়নি। কিন্তু এজাহারে উল্লেখ করা হয় ময়নাতদন্ত হয়েছে। ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করে বিল্লালের পরিবার। এখন তদন্ত কর্মকর্তা লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের পর মামলার তদন্ত শেষ করতে চান। লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মামলাটির তদন্ত আটকে আছে। কিন্তু বাদীপক্ষ কবর থেকে লাশ তুলতে বাধা দিচ্ছেন।
কেন লাশ তুলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে মামলার বাদী তাছলিমা বেগম আমাদের সময়কে বলেন, মাইনষে বলছে লাশ তুললে এই হইবো, ওই হইবো। তাই আমরা লাশ তুলতে চাই না।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সঞ্জয় সরকার আমাদের সময়কে বলেন, ভিকটিমের লাশ তুলতে ম্যাজিস্ট্রেটসহ আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবার লাশ তুলতে দিতে রাজি হচ্ছে না। তাদের বার বার বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু এখনও লাশ তোলা যায়নি। ফলে তদন্ত আটকে আছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হতাহতের বেশিরভাগ ঘটনাতে র্যাব, পুলিশ বা বিজিবি সদস্যরা গুলি করেছে তাদের সিনিয়র অফিসারের নির্দেশে। মামলার তদন্তকালে পুলিশকে বের করতে হচ্ছে গুলি চালানোর নির্দেশ কে দিয়েছিলেন। এ কাজ করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। বিশেষ করে র্যাব ও বিজিবির যেসব অফিসার গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন তাদের নামের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা চাকরিতে থাকলে চার্জশিটে অভিযুক্ত করতে সরকারের অনুমতি নিতে হচেছ। এতে চিঠি চালাচালি করতে অনেক সময় ব্যয় হচ্ছে। আবার তথ্যও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তদন্ত বিলম্বিত হচ্ছে।
হাআমা/
