যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থামছে না গাজার সহিংসতা। ঈদের গাজার ব্যস্ত বাজার এলাকার একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হামাসের সামরিক শাখার শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ ওদেহ নিহত হয়েছেন।
এর কয়েক দিন আগেই তার পূর্বসূরিও একই ধরনের হামলায় মারা যান।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় হামাসের সামরিক শাখার কমান্ডার মোহাম্মদ ওদেহ নিহত হয়েছেন। এই হামলায় কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় চিকিৎসক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, গাজা শহরের ব্যস্ততম বাজার এলাকার একটি আবাসিক ভবনে চালানো ওই হামলায় আরো কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী ও শিন বেত নিরাপত্তা সংস্থা জানায়, কয়েক মাস ধরে নজরদারির পর ওদেহের অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং তাকে আশ্রয় দেওয়া ভবনগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
বুধবার হামাস নিশ্চিত করে জানায়, শীর্ষ কমান্ডার ওদেহের স্ত্রী এবং দুই সন্তানও এই হামলায় নিহত হয়েছেন।
যদিও অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবারের হামলায় গাজা সিটির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আল-কায়ালি ভবনের ওপরের তিন তলা লক্ষ্য করা হয়।
ঈদুল আজহার আগমুহূর্তে আশপাশের রাস্তায় তখন ক্রেতাদের ভিড় ছিল।
উদ্ধারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ভিড়ের কারণে ভবনের ওপরের অংশে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, প্রায় একযোগে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে অন্তত পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ভবনটিতে আঘাত হানে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হামলার আগে তিনি ওপরে একটি হেলিকপ্টারের শব্দ শুনেছিলেন।
ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা যায়, অ্যাম্বুল্যান্স ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন এবং আশপাশে ভিড় জমেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও শিন বেতের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘হামাসের সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ওদেহকে নির্মূলের যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে, তাকে আশ্রয় দেওয়া গাজা সিটির কেন্দ্রের কয়েকটি ভবনে হামলা চালানো হয়েছে—কয়েক মাস ধরে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তার চলাচল ও সহযোগীদের অবস্থান অনুসরণ করা হয়।’
বিবৃতিতের আরো জানায়, একই অভিযানে এমন একটি অ্যাপার্টমেন্টেও হামলা করা হয়েছে, যেখানে ৭ অক্টোবরের হামলায় অংশ নেওয়া এক হামাস সদস্য থাকতেন।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, ওদেহের এক সন্তান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকালে মারা যায় এবং দুপুরের নামাজের পর গাজা সিটির একটি মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
ওদেহ হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের নতুন প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না পেলেও কয়েক দিন আগেই তাকে এই দায়িত্বে মনোনীত করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওদেহ ছিলেন ৭ অক্টোবরের গণহত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী। ইসরায়েলি নাগরিক ও আইডিএফ সেনাদের হত্যা, অপহরণ ও আহত করার জন্য দায়ী ছিলেন।
এর আগে গত মে মাসের শুরুতে হামাসের সশস্ত্র শাখার সাবেক কমান্ডার ইজ্জ আদ-দীন আল-হাদ্দাদও ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন।
ওই হামলাতেও একটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করা হয়েছিল এবং অন্তত তিনজন নিহত হন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও গাজায় নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
হামাস বারবার অভিযোগ করে বলেছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করছে।
অন্যদিকে গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময়ও ইসরায়েলি হামলায় ৯০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যা জাতিসংঘও নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
ইসরায়েল সরকার বলছে, তারা হামাস সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলার অধিকার রাখে এবং হামাস যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে বলে দাবি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন গাজা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলো এখনো কার্যকর হয়নি, কারণ ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার পর অগ্রগতি থমকে গেছে।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার ঘোষণা দেয়, যেখানে গাজার শাসন একটি অন্তর্বর্তী প্রযুক্তিবিদ প্রশাসনের হাতে যাওয়ার কথা ছিল এবং একই সঙ্গে অঞ্চলটির নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল।
তবে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। এর মধ্যেই হামাস তাদের পুলিশ বাহিনী পুনরায় সক্রিয় করেছে এবং নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বুধবার বলেন, হামাসকে ‘নাগরিক বা সামরিক—কোনোভাবেই গাজার শাসনে থাকতে দেওয়া হবে না।’
তিনি আরো বলেন, গাজা থেকে ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসনের পরিকল্পনা’ উপযুক্ত সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িতদের সবাইকে ইসরায়েল অনুসরণ করবে এবং দেরিতে হলেও এক দিন তাদের সবাইকে ধরা হবে।
হামাসের নেতৃত্বাধীন ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে, যার ফলে অঞ্চলটির বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং ২.১ মিলিয়ন মানুষের অনেকেই বাস্তুচ্যুত হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭২,৮০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
গাজায় সাম্প্রতিক হামলা এমন সময় হলো, যখন লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ৩১ জন নিহত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সেখানে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদারের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ও যোদ্ধারা।
হাআমা/
