আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ করছে ইসরায়েল। দেশটির কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেতসায়েল স্মোট্রিচের নেতৃত্বে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনার অধীনে এই মানচিত্র পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এমনভাবে বদলে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই নীতি মূলত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সাথে জুড়ে নেওয়ার জন্য।
ইসরায়েলি দৈনিক ‘ইসরায়েল হাইয়োম’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ দাবি করেন, বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন প্রকল্পে ‘বিপ্লব’ ঘটেছে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ১৬০টি নতুন খামার-বসতি (Farm Settlements) স্থাপন এবং ১০০টিরও বেশি নতুন বসতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, সাবেক ‘ডিসএঙ্গেজমেন্ট আইন’ আংশিক বাতিল করে উত্তর পশ্চিম তীরে পুনরায় বসতি স্থাপন শুরু হয়েছে এবং এর অবকাঠামো উন্নয়নে শত কোটি শেকেল বিনিয়োগ করা হচ্ছে। স্মোট্রিচ স্পষ্ট করে বলেন, এই খামার-বসতিগুলো এখন আর কেবল সাধারণ আবাসিক এলাকা নয়, বরং এগুলো হলো ফিলিস্তিনিদের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ভেঙে দিয়ে ইসরায়েলি বসতিগুলোর মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বা করিডোর গড়ে তোলার মূল হাতিয়ার। ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া পূর্ববর্তী মানচিত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগের মানচিত্রে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড সংযুক্ত ছিল এবং ইসরায়েলি বসতিগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দেখাত; কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়ার জন্য দিনরাত কাজ করছে। আসন্ন যেকোনো নির্বাচনের আগেই এই অবৈধ বসতিগুলোকে আইনি বৈধতা দিতে সরকার মরিয়া, যাতে ভবিষ্যতের কোনো নমনীয় সরকার চাইলেও এগুলো উচ্ছেদ করতে না পারে। স্মোট্রিচের দাবি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরায়েলি জনমত বদলে গেছে এবং এখন পশ্চিম তীর নিয়ে আলোচনা আদর্শিক নয়, বরং নিরাপত্তার সাথে যুক্ত।
এদিকে ইসরায়েলি দৈনিক ‘হারেৎজ’ এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা কেবলই বসতি সম্প্রসারণ নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড করার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক মহাপ্রকল্প। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত ইসরায়েল যেখানে ১২৭টি বসতি স্থাপন করেছিল, সেখানে বর্তমান ডানপন্থী সরকার একাই ১০৩টি নতুন বসতি এবং আরও ৩০০টি অবৈধ আউটপোস্টকে (বিক্ষিপ্ত বসতি) বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পশ্চিম তীরের প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন এনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্মোট্রিচকে ‘সি’ অঞ্চলের (ওসলো চুক্তি অনুযায়ী যা পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এবং সম্পূর্ণ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে) পরিকল্পনা, নির্মাণ ও বেসামরিক প্রশাসনের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ায় এই কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৬০ হাজার নতুন আবাসন ইউনিটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী দফতর (ওচা) এর তথ্যমতে, বর্তমানে পশ্চিম তীরে ৯২৫টি ইসরায়েলি নিরাপত্তা চৌকি বা চেকপোস্ট রয়েছে, যার কারণে ফিলিস্তিনিদের এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘পিস নাউ’ (Peace Now)-এর বসতি পর্যবেক্ষণ দলের সদস্য হাগিত ওফরান সতর্ক করে বলেছেন, গত তিন বছরে পশ্চিম তীরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। শত কোটি শেকেল ব্যয় করে অবকাঠামো নির্মাণ, ফিলিস্তিনিদের জমি দখল এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার এই আত্মঘাতী নীতি ইসরায়েলের ওপর দীর্ঘমেয়াদে বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ এর মতে, এই উন্মাদনা ইসরায়েলকে বিশ্বমঞ্চে আরও একঘরে করে তুলবে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এবার সামরিক ফায়ারিং জোন এবং ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির ওপরেও জোরপূর্বক বসতি গড়ে তোলার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে। এই বিষয়ে ইসরায়েলি গবেষক শৌল আরিয়েলি মনে করেন, নতুন বসতিগুলোর বড় অংশ এখনো আইনি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপে থাকলেও, এর ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো দ্বি-রাষ্ট্র ভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধানের পথ দিন দিন আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
টিএইচএ/
