আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের নিরস্ত্রিকরণ ছাড়াই অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন কাজ শুরু করার জন্য ইসরায়েলকে নতুন প্রস্তাবনা বা রূপরেখা হস্তান্তর করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘কান’ (হেইয়াহ আল-বাথ) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ সমাপ্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন এই নথির ওপর ইসরায়েলের কাছ থেকে দ্রুত লিখিত অনুমোদন প্রত্যাশা করছে, যা মূলত গাজায় পুনরায় যুদ্ধ শুরু না করার মার্কিন সদিচ্ছা এবং ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনের তীব্র চাপের বহিঃপ্রকাশ। তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত ইসরায়েল বা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নথির বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তি অনুসারে গাজায় পানি, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন মৌলিক অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি দিতে ইসরায়েল বাধ্য থাকবে। একই সাথে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে সাধারণ বাসিন্দাদের ‘পিস কাউন্সিল’ বা শান্তি পরিষদের অধীনস্থ নিরাপদ অঞ্চলে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া গাজায় একটি টেকনোক্র্যাট বা অরাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেন্দ্রীয় সদর দফতর স্থাপন, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনীর জন্য সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি প্রবেশ নিশ্চিত করে ইউরোপীয় হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার বিষয়গুলোও এই নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নতুন এই রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার অধীনে গাজা থেকে সংগৃহীত করের অর্থ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শান্তি পরিষদের তহবিলে স্থানান্তর করা হবে এবং এই টেকনোক্র্যাট সরকারকে গাজার একটি সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হবে। এই সরকারের কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে গাজার ভেতরে ও বাইরে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হবে এবং হামাসের কর আদায়ের সক্ষমতা কমাতে ডিজিটাল পেমেন্ট ও জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া যারা স্বেচ্ছায় অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তির পথে আসবে, তাদের জন্য শর্তসাপেক্ষ ক্ষমার বিধান রাখা হয়েছে এবং গাজায় বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকা ফোর-জি (4G) ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালুর অনুমতি দেবে ইসরায়েল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এই নথিতে ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ এবং তাদের সহায়তার জন্য একটি ‘অস্ত্রহীন ফিলিস্তিনি সিভিল গার্ড’ বাহিনী গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে হামাস যদি নিরস্ত্রিকরণের শর্ত পুরোপুরি লঙ্ঘন করে, তবে ইসরায়েল তার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েলকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, গাজায় পুনরায় পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করার কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই এবং হামাস অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানালেও তাদের বিকল্প একটি শাসনব্যবস্থা দাঁড় করানোর এখনই উপযুক্ত সময়।
এদিকে অন্য এক প্রতিবেদনে ‘টাইমস্ অব ইসরায়েল’ কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মিশরের মাটিতে এই নতুন পুলিশ বাহিনীর প্রশিক্ষণের বিষয়ে কায়রো সম্মতি প্রকাশ করেছে এবং আরও চারটি দেশ এই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীতে সেনা পাঠাতে রাজি হয়েছে। তবে এই বাহিনী মোতায়েনের জন্য ইসরায়েলের চূড়ান্ত আইনি ও কূটনৈতিক অনুমোদনের প্রয়োজন, যা এখনো ঝুলে রয়েছে। অন্যদিকে আসন্ন নেসেট (ইসরায়েলি সংসদ) নির্বাচনকে সামনে রেখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার এই পরিকল্পনাগুলোতে আশানুরূপ সহযোগিতা করছে না, যার ফলে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা প্রশাসন ও পুনর্গঠন কমিটির প্রতিনিধিরা সাইপ্রাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন বলে দেশটির সরকারি মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি হোয়াইট হাউস গাজার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের কাঠামো হিসেবে পিস কাউন্সিল, গাজা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল, টেকনোক্র্যাট সরকার এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর অনুমোদন দেয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্বে পিস কাউন্সিলের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মূলত ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস, ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ১ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার পর, জাতিসংঘ ঘোষিত ৭০ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল পুনর্গঠন যজ্ঞ ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের অধীনে পরিচালিত হতে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
টিএইচএ/
