বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী শফিউদ্দীন সরদার বাংলা সাহিত্যের এক আলোকিত পুরুষ। তিনি শিক্ষকতা করেন এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন শফীউদ্দিন সরদার। তিনি নাটোরের হাটবিলা গ্রামে ১৯৩৫ সালে জন্ম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যু বরণ করেন ২০১৯ সালে। তিনি ছিলেন শেকড় সন্ধানী লেখক। তিনি বেশ পরিণত বয়সে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।
ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের কাহিনি অবলম্বন করে তাঁর উপন্যাস লেখার সূচনা। তিনি বিগদ্ধজনের পক্ষ থেকে অনুপ্রেরণায় সিক্ত হতে থাকেন। ফলে একে একে রচনা করেন ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’, ‘গৌড় থেকে সোনারগাঁ’, ‘যায় বেলা অবেলায়’, ‘বিদ্রোহী জাতক’, ‘বার পাইকার দূর্গ’, ‘রাজবিহঙ্গ’, ‘বারো ভূঁইয়া উপাখ্যান’, ‘প্রেম ও পূর্ণিমা’, ‘বিপন্ন প্রহর’, ‘সূর্যাস্ত’, ‘পথহারা পাখি’, ‘বৈরী বসতি’, ‘অন্তরে প্রান্তরে’, ‘দাবানল’, ‘ঠিকানা‘, ‘ঝড়মুখী ঘর’, এবং ‘রোহিনী নদীর তীরে’সহ অনেক পাঠকনন্দিত ঐতিহাসিক উপন্যাস। এ ছাড়াও তিনি সামাজিক উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, নাটক, রম্য ও কল্প কাহিনিসহ ৬০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসের বেশ অভাব। অথচ এই দেশ ও জাতির রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এই অভাব অনেকটা শফীউদ্দিন সরদার পূরণ করেছেন।
উর্দু ভাষার কথাসাহিত্যিক নসীম হিজাজি স্পেন ও সিন্ধু বিজয়সহ মুসলিম জাতির নানা যুদ্ধ ও শৌর্যবীর্যের কাহিনি তাঁর উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। পক্ষান্তরে শফীউদ্দিন সরদারের প্রেক্ষাপট ছিল উপমহাদেশ। তবে উভয়ের চিন্তায় ছিল উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ, অগ্রগতি ও প্রতিষ্ঠা। চেতনা ও শিল্পরূপ বৈচিত্রে উভয়ে অভিন্ন।
কবি আল মাহমুদের ভাষায়, ‘শফীউদ্দিন সরদার বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। যিনি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম বীরত্বগাঁথার মহান উপস্থাপক। তিনি আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কথাশিল্পী।’
বিশিষ্ট লেখক মাহমুদ ইউসুফ বলেন, ‘তাঁর উপন্যাসের ভাব-ভাষা-ভঙ্গি ও সুষমার সমন্বিতরূপ ক্লাসিক্যাল মর্যাদায় অভিষিক্ত। ধ্রুপদী মানে উত্তীর্ণ এসব উপন্যাস সব সময়ের, সব যুগের, সব মানুষের উপযোগী। মানুষের আত্মার সাথে সম্পৃক্ত এ ধরনের শিল্প-সাহিত্য বাংলা ভাষায় খুব কমসংখ্যক লক্ষ্যণীয়। শফীউদ্দীন সরদার এক্ষেত্রে অতুলনীয়। তাঁর নির্মাণ-কলা ও শিল্পোৎকর্ষের চমৎকার নিদর্শন উপন্যাসগুলো। ভারতের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী গোলাম আহমাদ মোর্তজা যাকে বলেছেন, ‘ইতিহাসের ইতিহাস বা চেপে রাখা ইতিহাস।’ জাতীয় প্রয়োজনেই এসব লুপ্ত ইতিহাসের মনিমাণিক্য ও গুপ্ত ভা-ার উদ্ধার হওয়া দরকার। আর এ কাজটিই করেছেন শফীউদ্দীন সরদার।’
তাঁর উপন্যাসগুলো কেবল বাঙালি মুসলিমদের জন্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঐতিহাসিকভাবে প্রমানিত, এদেশে ইসলাম এসেছে বখতিয়ারে বঙ্গবিজয়েরও বহু আগে। কিন্তু শাসক হিসেবে বিজয়ীর বেশে এসেছিলেন বখতিয়ার। মুসলিমদেও এই আটশো বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে উপন্যাসের মোড়কে তুলে ধরেছেন শফীউদ্দীন সরদার। ধারাবাহিকভাবে তিনি সাহিত্য ভান্ডারে একে একে যুক্ত করেছেন ২৭টি উপন্যাস যা এককভাবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল। আজ শেকড় সন্ধানী ঔপন্যাসিক শফীউদ্দিন সরদারের জন্ম দিন। তাঁর প্রতি স্বশ্রদ্ধ সালাম।
এনএ/
