দুনিয়া জান্নাতের পাথেয় তৈরির জায়গা

শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) বাদ মাগরিব বয়ানে মাওলানা ইবরাহিম দেওলা

by Fatih Work

আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে সামান্য সময়ের জন্য জীবন দান করেছেন। এ সময়টুকু বড় গুরুত্বপূর্ণ। দুনিয়া হল আখেরাত তৈরির জায়গা। প্রসিদ্ধ কথা আছে, দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। মানুষ ক্ষেত করে, বীজ বপন করে, চাষবাস করে, এরপর এক সময় ফসল ঘরে তোলে। ফসলের বীজ যে বুনবে, সে-ই তো ফসল ঘরে তুলতে পারবে। যে ব্যক্তি বীজ বুনবে না, সে তো ফসল ঘরে তুলতে পারবে না। সে উপকৃত হতে পারবে না। কেউ আনারের বাগান লাগালে, আঙ্গুরের বাগান লাগালে, সে এসব ফলই তুলতে পারবে। উল্টো যদি কেউ যদি জমিনে চাষ না করে, জমিনের পেছনে মেহনত না করে, বীজ বপন না করে, তাহলে দেখা যাবে, ফসল তোলার সময় সবাই ফসল ঘরে তুলবে, আর সে কিছুই তুলতে পারবে না। তাকে খালি হাতে ফিরতে হবে। ঠিক তেমনিভাবে যে ব্যক্তি এ দুনিয়ার সময় কাজে লাগাবে, আখেরাতের জন্য সম্পদ জমা করবে, সে আখেরাতে ফসল তুলতে পারবে। আখেরাতে সে উপকৃত হতে পারবে।

হাদিসে আছে, মানুষ গাফলতের ভেতর আছে, তার কাজ করণীয় সে করে না। কিন্তু মৃত্যু এসে গেলে সে জাগ্রত হবে। তখন জাগ্রত হলে কোনো লাভ হবে না। যতই আফসোস করুক না কেন, এই আফসোস কোনো কাজে আসবে না। কারণ, যখন আমল করার সময় ছিল, যখন মেহনতের সময় ছিল, তখন করেনি, এখন আর সময় নাই। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, ‘পরিশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন তারা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে (দুনিয়াতে) ওয়াপস পাঠিয়ে দিন। যাতে আমি যা (দুনিয়া) ছেড়ে এসেছি, সেখানে গিয়ে সৎকাজ করতে পারি। কখনো না। এটা একটা কথার কথা, যা সে মুখে বলছে মাত্র। তাদের (মৃতদের) সামনে রয়েছে বরজখ, যা তাদেরকে পুনরুত্থিত করার দিন পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে’। (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০) আবার দুনিয়ায় ফিরে আসার আবেদন গ্রহণ করা হবে না। মৃত্যুর পর বরজখে থাকতে হবে। মানুষের কেয়ামত পর্যন্ত বরজখে থাকতে হবে। সেখানে নেককার মানুষ শান্তিতে থাকবে, বদকার মানুষ আজাবে থাকবে।

বিজ্ঞাপন
banner

কিছু মানুষ মনে করে, দুনিয়ার পরে আর কোনো জীবন নেই। এজন্য তারা দুনিয়াকে মউজ-মাস্তি করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। আখেরাত বোঝে না। তারা মনে করে, মৃত্যুর পর তো মাটি হয়ে যাব। আর কোনো জগত নেই। যখন তাদের বলা হয়, মৃত্যুর পর তো আরেক জীবন আছে, ওটাই আসল জীবন, চিরস্থায়ী জীবন। তারা বলে, ‘যে বিষয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে, সেটা তো সম্পূর্ণ অসম্ভব ও অকল্পনীয় ব্যাপার! জীবন তো এই ইহজীবনই, আর কিছু নয়। (এখানেই) আমরা মরি ও বাঁচি। আমাদের ফের জীবিত করা যাবে না’। (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৩৬-৩৭) তাদের যখন বলা হয়, মরণের পর আখেরাত আছে, হিসাব আছে, পুরসিরাত আছে, জান্নাত-জাহান্নাম আছে, তারা এসবে ভ্রুক্ষেপ করে না। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি, মরণের পরে আরো একটি জীবন আছে। এটা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। কুরআনের আয়াত আছে, ‘সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে থাকলে সে তা দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করে থাকলে তাও দেখতে পাবে’। (সুরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮) দুনিয়াতে কেউ সামান্য পরিমাণ ভালো কাজ, নেকির কাজ করলে সে তার প্রতিদান পাবে। বিপরীতে সামান্য পরিমাণ গুনাহের কাজ করলে শাস্তি পাবে।

আখেরাতে যার ব্যাপারে জান্নাতের ফয়সালা হবে, কুরআনের ভাষায় এ লোক সফলকাম। আল্লাহ বলেছেন, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হবে, সে-ই প্রকৃত অর্থে সফলকাম হবে। আর (জান্নাতের বিপরীতে) পার্থিব জীবন তো প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়’। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫) প্রত্যক প্রাণিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কুরআনে মৃত্যুর খবরকে দৃঢ়তার সাথে বলেছে। মৃত্যু পর্যন্ত ইবাদত করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘নিজ প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকো যাবত না যার আগমন সুনিশ্চিত (মৃত্যু) তোমার কাছে তা এসে যায়’। (সুরা হিজর, আয়াত: ৯৯) মৃত্যুকে এ আয়াতে ‘একিন’ বলা হয়েছে। এ কারণে যে, মৃত্যুর ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিছু মানুষ নিজের জন্ম নিয়ে ভুল ধারণার ভেতর আছে। তারা মনে করে, তারা নিজে নিজে সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহ তাদের সৃষ্টিকর্তা নন! (নাউজুবিল্লাহ) আবার কিছু লোক বলে তারা নাকি মানুষ থেকে সৃষ্ট না, তারা বানর থেকে সৃষ্ট! বানর থেকে তারা নাকি পর্যায়ক্রমে মানুষে রূপান্তর হয়েছে! কিছু মানুষ আশ্চর্য ধরনের কথাবার্তা বলে থাকে। এসব কথা কুফুরি কথা।

ভাই দোস্ত! দুনিয়াতে এমন কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না, যিনি বলেছেন মৃত্যু হবে না। সবাই এ কথার ওপর একমত মৃত্যু হবেই। যদি মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন না থাকতো, তাহলে তো নবীদের দরকার ছিল না, কুরআন-হাদিসের দরকার ছিল, তাবলিগ-দাওয়াতের দরকার ছিল না। এসব থাকার অর্থই হল, মৃত্যুর পর আরেকটি জগত আছে, হাশর-মিজান আছে, জান্নাত-জাহান্নাম আছে।

যার ব্যাপারে আখেরাতে জান্নাতের সিদ্ধান্ত হবে, সে শুধু নেয়ামত আর নেয়ামতে ডুবে থাকবে। জান্নাতিরা সর্বদা যুবক থাকবে বৃদ্ধ হবে না, জান্নাতিরা সব সময় সুস্থ থাকবে কখনো অসুস্থ হবে না। সর্বক্ষণ আরাম, শান্তি, ইজ্জতের ভেতর থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তাদের আর কখনোই মৃত্যু হবে না। আখেরাতের জীবনই আসল জীবন। আর আল্লাহ তায়ালা আমাদের দুনিয়ার জীবন দান করেছেন আখেরাতের জীবনে শান্তির সামানা প্রস্তুতের জন্য।

দুনিয়ার জীবনে মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হয়। যুবক থেকে বৃদ্ধ হতে হয়, সুস্থতার ভেতরেও অসুস্থতা থাকে। খুশির সাথে পেরেশানীর অস্থিরতা থাকে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, জীবনের সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক লেগে রয়েছে। কেউই এক অবস্থায় থাকে না। বিভিন্ন অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু জান্নাতে চারটি জিনিস থাকবে না। জান্নাতে মৃত্যু থাকবে না, বৃদ্ধ হবে না, অসুস্থ হবে না, পেরেশানী হবে না। আল্লাহ তায়ালা জান্নাতিদের হজরত আদম আ.-এর মত শরীর দেবেন, ইউসুফ আ.-এর মত সৌন্দর্য দেবেন, দাউদ আ.-এর মত কণ্ঠ দেবেন। দাউদ আ. যখন জবুর কিতাব পড়তেন, পাহাড়, পশু-পাখিও তার কণ্ঠে পাগল হয়ে যেত। এমন সুমধুর কণ্ঠ আল্লাহ জান্নাতিদের দান করবেন। প্রত্যেক জান্নাতিকে আল্লাহ তায়ালা নবী করিম সা.-এর মত আখলাক দান করবেন। এটা সবচেয়ে বড় অর্জন। সুরা রহমান কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ সুরা। আল্লাহ তায়ালা এ সুরায় ৩৬ বার মানুষ ও জিনকে প্রশ্ন করেছেন। এই দুই জাতিই শরিয়ত অনুসরণের যোগ্য, অন্যরা নয়। অন্য সব সৃষ্টিকে আল্লাহ মানুষ ও জিন জাতির খেদমতে লাগিয়েছেন। মানুষ ও জিন জাতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জান্নাত-জাহান্নামের ফয়সালা এ দুই জাতির ব্যাপারেই করা হবে। আল্লাহ তায়ালা সুরা রহমান জান্নাতিদের পাঠ করে শোনাবেন। দুনিয়ার কোনো সুকণ্ঠের অধিকারী কারি যদি কুরআন তেলোয়াত করে শোনায়, তাহলে শুনতে কতই না ভালো লাগে, তাহলে ভাবুন, আল্লাহ তায়ালা যখন কুরআন শোনাবেন কেমন ভালো লাগবে! জান্নাতিদের আল্লাহ তায়ালা নিজের দিদার করাবেন। এটা সবচেয়ে বড় নেয়ামত। জান্নাতে এত এত নেয়ামত আছে, সেসবের আলোচনা শুনলে মনে হয় এখনই মৃত্যু এসে যাক, আর জান্নাতে চলে যায়!

এজন্য সমস্ত নবী আ. এ জান্নাতের আলোচনা করেছেন, জান্নাতের দাওয়াত দিয়েছেন। সব নবীই আ. উম্মতকে সতর্ক করেছেন, দুনিয়ায় থাকতেই জান্নাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে বলেছেন। এ জগত থেকেই জান্নাত অর্জনের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেছেন।

শ্রুতিলিখন: আমিরুল ইসলাম লুকমান

এনএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222