আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে একটি আধুনিক ভূগর্ভস্থ মার্কেট। পুলে-খিশতি এলাকায় নির্মিত এই বাজারের মাধ্যমে শহরের যানজট কমানো এবং সংগঠিত বাণিজ্যিক পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে দেশটির তালেবান সরকার।
কাবুল পৌরসভার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ১০ লাখ আফগানি। প্রায় দুই বছরের নির্মাণ শেষে সম্প্রতি তালেবান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি চালু হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাবুল পৌরসভার উপপ্রধান মুহাম্মদ খালিদ সাজিস্তানি বলেন, “এই বাজার কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়; নগর ব্যবস্থাপনায় এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।”
পৌরসভা জানিয়েছে, বাজারের মালিকানা ও পরিচালনার জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩০ বছরের চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাজার থেকে অর্জিত আয়ের ৬৫ শতাংশ যাবে ওই কোম্পানির কাছে, অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ পৌরসভায় জমা হবে।
মাটির নিচে নির্মিত এই বাজারে রয়েছে প্রায় ৩৪০টি দোকান, ছয়টি প্রবেশদ্বার এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দোকানগুলোতে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও থাকবে ব্যবসার সুযোগ।

পৌরসভার প্রতিনিধি নেমাতুল্লাহ বারাকজাই বলেন, “পুলে-খিশতি কাবুলের সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা। রাস্তায় হকারদের কারণে প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। বাজারটি চালু হলে হকাররা নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা করতে পারবে, আর নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচলও সহজ হবে।”
প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন প্রায় এক হাজার শ্রমিক, আর পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে তিন থেকে চার হাজার মানুষের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানির কর্মকর্তা মাইওয়ান্দ বলেন, “সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন আমাদের জন্য গর্বের। এটি কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও নতুন বাজারের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কাবুলের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বলেন, “ভূগর্ভস্থ বাজারটি দারুণ উদ্যোগ। এটি যানজটের সমস্যা কমাবে এবং আমাদের শহরের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করবে।” অন্যদের মতে, কাবুলের আরও কয়েকটি ব্যস্ত এলাকায় একই ধরনের বাজার তৈরি করা হলে নগর জীবনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তালেবান সরকার রাজধানী পুনর্গঠন ও নগর উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। “নিউ কাবুল সিটি” নামে নতুন শহর গড়ার পাশাপাশি রাস্তা, সেতু, পার্ক, খাল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা চলছে। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কাবুলে প্রায় ২০০টি উন্নয়ন প্রকল্প কার্যক্রম চলছে, যার মধ্যে ভূগর্ভস্থ বাজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
শহর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাবুলের মতো জনবহুল নগরে মাটির নিচে বাজার বা পার্কিং স্পেস তৈরি বিশ্বজুড়েই একটি প্রচলিত সমাধান। তবে প্রকল্প সফল করতে হলে বাজারের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন।
উদ্বোধনের পর বাজারে দোকান বরাদ্দ ও পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাজারের ভেতর এবং চারপাশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রকল্প আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একদিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়বে, অন্যদিকে শহরের অবকাঠামো হবে আরও সুশৃঙ্খল। তবে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে কাবুলে মাটির নিচে তৈরি হওয়া এই আধুনিক ভূগর্ভস্থ মার্কেট আফগানিস্তানের নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিকচিহ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার আশা করছে, বাজারটি কেবল বাণিজ্য নয়, শহরের যানজট ও হকার সমস্যারও টেকসই সমাধান এনে দেবে।
এনএ/
