মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে।
রণতরী, আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং বিশাল সৈন্য বহর মোতায়েনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন যখন চাপ সৃষ্টি করছে, তেহরানও তখন পাল্টা সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক চালে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুমকি সত্ত্বেও ইরান পিছু না হটে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ইরানের বেশ কিছু পারমাণবিক স্থাপনার স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশ করেছে, যা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেহরান তাদের স্থাপনাগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সাথে সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে রাশিয়া থেকে অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও ফাইটার জেট সংগ্রহ করেছে দেশটি। একই সঙ্গে আকস্মিক হামলা মোকাবিলায় নিজেদের বিমান ঘাঁটিগুলো দ্রুত সংস্কার করে ‘র্যাপিড কাউন্টার-অ্যাটাক’ বা পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে ইরান।
ইরানের সামরিক প্রস্তুতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সেমনান প্রদেশের শাহরুদ শহর, যেখানে দেশটির বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র অবস্থিত। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ও আগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে এই কেন্দ্রটিকে নতুন প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শাহরুদের এই পুনর্গঠিত কেন্দ্রে এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও বিপুল পরিমাণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
রণপ্রস্তুতির পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে নৌ-মহড়া জোরদার করেছে ইরান। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘স্ট্রেইট অফ হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালীতে রাশিয়ার সাথে যৌথ মহড়া চালিয়ে ওয়াশিংটনকে কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে তেহরান। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কঠোর হস্তে দমনের পাশাপাশি ইরান সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হলে তা কেবল সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে ইরান সরকার ‘ডিফেন্স কাউন্সিল’ নামে একটি নতুন উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, যার সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার আলী শামখানি। তবে যুদ্ধের এই দামামার মধ্যেই জেনেভায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ তিন ঘণ্টা আলোচনা করলেও কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
টিএইচএ/
