ভারতের হিমালয় পর্বতমালার অন্যতম পবিত্র একটি হিন্দু মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার আগে দর্শনার্থীদের বিশ্বাসের পরীক্ষা হিসেবে গরুর মূত্র পান করতে হয়। উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী মন্দিরে প্রবেশের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক দর্শনার্থীর জন্য ‘পঞ্চগব্য’ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। এটি গো-জাত পাঁচটি উপাদান—দুধ, দই, ঘি, মধু এবং গোমূত্র—দিয়ে তৈরি একটি আনুষ্ঠানিক মিশ্রণ। মন্দিরটির তত্ত্বাবধায়ক কমিটির মতে, এর উদ্দেশ্য হলো অবিশ্বাসীদের প্রবেশ ঠেকানো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
মন্দির পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ধর্মেন্দ্র সেমওয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, ‘গঙ্গোত্রী মন্দির থেকে অ-সনাতনী ও অবিশ্বাসী ব্যক্তিদের দূরে রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা। প্রকৃত বিশ্বাসীদের এটি গ্রহণে কোনো সমস্যা হবে না। কেবলমাত্র যারা ছদ্মবেশে প্রবেশ করবে এবং ধর্মে যাদের কোনো বিশ্বাস নেই, তাদেরই সমস্যা হবে। তাদের অনুমতি দেওয়া হবে না।’
নতুন এই ব্যবস্থাটি মন্দিরের ফটকগুলিতে কার্যকর করা হবে, যেখানে মন্দিরের কর্মীরা ভক্তদের প্রবেশের আগে ‘পবিত্র জল’ সরবরাহ করবেন।
সেমওয়াল বলেছেন, ‘এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতা ফিরিয়ে আনবে এবং যারা এটি গ্রহণ করার সুযোগ পাবেন, তাদের নিজেদের ভাগ্যবান মনে করা উচিত।’
রোববার (১৯ এপ্রিল) হিন্দুদের ‘চার ধাম যাত্রা’ নামক একটি প্রধান বার্ষিক তীর্থযাত্রা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন এই নিয়ম ঘোষণা করা হয়। এই তীর্থযাত্রায় হিমালয়ের উচ্চভূমিতে অবস্থিত গঙ্গোত্রী মন্দিরসহ চারটি মন্দিরে লাখো ভক্তের সমাগম ঘটে। তীর্থযাত্রীরা সাধারণত প্রথমে যমুনোত্রী মন্দির এবং তারপর ক্রমানুসারে গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথ দর্শন করেন। এই যাত্রাপথে দীর্ঘ সড়ক ভ্রমণ এবং কিছু ক্ষেত্রে খাড়া পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করতে হয়।
ভারতের অনেক মন্দিরই অধার্মিক ও পর্যটকদের স্বাগত জানায় এবং আগ্রহীদের কাছে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করে। কিন্তু সবাই এতটা উদার নয়; মার্চ মাসে বদ্রীনাথ-কেদারনাথ মন্দির কমিটি তাদের ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকা ৪৭টি মন্দিরে অ-হিন্দুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে একটি আদেশ জারি করে।
সেমওয়াল বলেছেন, চার ধামের তীর্থযাত্রীরা ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছেন এবং গঙ্গোত্রী মন্দিরে গোমূত্র মিশ্রিত ‘পবিত্র জল’ পান করতে এখনও পর্যন্ত কেউই আপত্তি জানাননি।
যদিও হিন্দুধর্মে গরুকে পবিত্র বলে মনে করা হয় এবং শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানে এর মূত্র ব্যবহৃত হয়, তবুও এর ভক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হলে সেইসব হিন্দুরা ক্ষুব্ধ হতে পারেন যারা এই প্রথাটি সমর্থন করেন না বা এতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। মন্দির কমিটির এই নির্দেশ অ-হিন্দুদের ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং ঐতিহ্যগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ধর্মীয় পরিসরকে সংকুচিত করার জন্যও সমালোচিত হচ্ছে।
গোমূত্র পানের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও বিভাজনমূলক, কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি দলের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো এর ঔষধি গুণ রয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে নিয়মিত প্রচার করে থাকে।
যোগগুরু বাবা রামদেব প্রকাশ্যে বিজেপিকে সমর্থন করেন, তিনি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের যাচাইবিহীন স্বাস্থ্য দাবির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তার আয়ুর্বেদিক ব্র্যান্ডের অধীনে গোমূত্রযুক্ত পণ্য বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করেন।
বিজেপি কর্মীরা প্রায়শই গোমূত্র ব্যবহার করে শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান করে থাকেন। এবং কোভিড মহামারীর সময় দলটির পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রাক্তন প্রধান ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মানুষকে গোমূত্র ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন – যার ফলে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেন যে এমনটা করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তীর্থযাত্রার ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নতুন নিয়ম বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। গত বছর শুধু কেদারনাথেই প্রায় ১৮ লাখ দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছিল। রাজ্য পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাত মাসেরও কম সময়ে চারটি মন্দির মিলিয়ে ৫১ লাখ দর্শনার্থী এসেছিলেন।
হাআমা/
