দখলদার ইসরাইলের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ ইহুদি মূল্যবোধের সঙ্গে ‘অসংগতিপূর্ণ’ হয়ে উঠছে বলে হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় প্রগতিশীল রাবাইরা (ইহুদি ধর্মীয় নেতা)। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ইসরাইল সরকারের সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের প্রতি ‘অবিশ্বাস’ নয় বরং এটি একজন ইহুদির ‘ধর্মীয় দায়িত্ব’।
যুক্তরাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সিনাগগের প্রতিনিধিত্বকারী নবগঠিত সংগঠন ‘প্রগ্রেসিভ জুডাইজম’-এর দুই প্রধান নেতা রাবাই চার্লি ব্যাগিনস্কি এবং রাবাই জশ লেভি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, ইসরাইলের বর্তমান কর্মকাণ্ড কেবল দেশটির নিজের জন্যই নয় বরং খোদ ইহুদি ধর্মের জন্যই এক ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করতে পারে।
সংগঠনটির প্রথম বই ‘প্রগ্রেসিভ জুডাইজম, জায়োনিজম অ্যান্ড দ্য স্টেট অব ইসরাইল’-এর প্রকাশনা উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারা এসব কথা বলেন।
ইহুদি ধর্মের রক্ষণশীল ধারার বাইরে যারা আধুনিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে ধর্মচর্চা করেন, তারাই মূলত প্রগতিশীল রাবাই। তারা মনে করেন, ধর্মীয় বিধানগুলো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল এবং তা অবশ্যই আধুনিক মানবাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
রাবাই ব্যাগিনস্কি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বলি যে ইসরাইলের বর্তমান গতিপথ ইহুদিদের জন্য নয় বরং ইহুদি ধর্মের জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন ইসরাইল সরকারের নীতি আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখন সেটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়’।
রাবাই জশ লেভি যুক্তি দেন যে, সরকারের সমালোচনা করা কোনোভাবেই ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়। তিনি বলেন, ‘ইসরাইল সরকার যা করে, তার প্রভাব আমাদের ওপর এবং আমাদের ধর্মের ওপর পড়ে। তাই এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা’।
প্রগ্রেসিভ জুডাইজম একটি জায়োনিস্ট আন্দোলন যা একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের সমর্থক। তবে এ বইটিতে এমন অনেকের প্রবন্ধও স্থান পেয়েছে যারা নিজেদের জায়োনিস্ট বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। মতের এ ভিন্নতাকে সংগঠনের নেতারা ‘শক্তির উৎস’ হিসেবে দেখছেন।
নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, উগ্র ডানপন্থি ইসরাইলি নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ এবং ইতামার বেন-গভিরের প্রচারিত ‘জায়োনিজম’-এর সঙ্গে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মিল নেই। ব্যাগিনস্কি বলেন, ‘আমার জায়োনিজম ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকেও স্বীকৃতি দেয়। আমরা দেখাতে চাই যে, আমাদের ধর্মীয় জায়োনিজম পশ্চিম তীরে দেখা যাওয়া উগ্রপন্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা’।
ইসরাইলি নীতি এবং গাজা যুদ্ধের সমালোচনা করায় গত বছর ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের একাংশের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এই দুই নেতাকে। জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক সভায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে কথা বলায় তাদের দুয়ো ধ্বনি দেওয়া হয়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করে ব্যাগিনস্কি বলেন, ‘মুহূর্তটি বেদনাদায়ক ছিল, কিন্তু আমি ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও ন্যায়বিচারের কথা বলা থেকে পিছপা হব না।’
ইহুদি পরিচিতি, জায়োনিজম এবং ইসরাইল নিয়ে চলমান উত্তপ্ত বিতর্কের মধ্যে এই ধর্মীয় নেতাদের এমন অবস্থান ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের ভেতরে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান/এএফপি
