বন্যায় ডুবল সুনামগঞ্জের হাওর, অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে কাটা ধান

by Abid

গত কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খেতের পাকা ও আধা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় কাটা ধানে অঙ্কুর গজাতে শুরু করায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই বোরো ফসল হারিয়ে শত শত কৃষক পরিবার এখন দিশেহারা।

সোমবার সকালে দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশ ঘুরে দেখা গেছে, হাওরের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন জলমগ্ন। পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বিল ও জলাশয় থেকে ভেসে আসা কচুরিপানায় ঢেকে গেছে ধানখেত, যা দেখে ফসলি জমি ও জলাশয়ের পার্থক্য করার উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন
banner

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হাসন বসত গ্রামের কৃষক ছাদ মিয়ার আবাদি আট কেয়ার জমির মধ্যে বড় একটি অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, চার কেয়ার জমির ধান কাটতে পারলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই ধানে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা অন্যান্য কৃষকদেরও। একদিকে ধানের এই মরণদশা, অন্যদিকে গবাদিপশুর খাদ্য খড় শুকানো নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় ভিজে যাওয়া খড় পচে যাচ্ছে, ফলে কৃষকরা নিজেদের খাবারের পাশাপাশি গবাদিপশুর প্রাণ বাঁচানো নিয়েও গভীর সংকটে পড়েছেন। হাসন বসত গ্রামের গৃহিণী জমিলা খাতুন আক্ষেপ করে জানান, ধান ও খড় দুটোই নষ্ট হওয়ায় পরিবার ও গবাদিপশু নিয়ে তারা এখন ঘোর বিপদে আছেন।

পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটতে অনীহা দেখাচ্ছেন কৃষি শ্রমিকরাও। সোমবার সকালে দেখার হাওরের ঝাউয়ার অংশে দেখা যায়, শ্রমিকরা ধান কাটতে গিয়েও ফিরে আসছেন। শ্রমিক দলনেতা নজরুল ইসলাম জানান, কোমর সমান বা গলাপানি ভেঙে ধান কাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঠান্ডাজনিত অসুস্থতার ভয় থাকায় কোনো শ্রমিক বা ‘বেপারি’ এই ডুবন্ত ধান কাটতে রাজি হচ্ছে না। সদর উপজেলার কালিপুর গ্রামের কৃষক সাদিকুর রহমান জানান, ঋণ করে আবাদ করা তার জমির অধিকাংশ ধান এখন পানির নিচে, আর শ্রমিকরা কাজ করতে না চাওয়ায় ফসল ঘরে তোলার সব আশা শেষ হয়ে গেছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সোমবার সকালে ৪ দশমিক ৮৭ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যার এই ধাক্কা শুধু কৃষকদের নয়, ধান মাড়াই যন্ত্রের (বোমা মেশিন) মালিক ও চালকদেরও বড় ধরনের আর্থিক লোকসানে ফেলেছে। মেশিন সংস্কারে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করলেও ধান না থাকায় তারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না। কালিপুর গ্রামের সিরাজ মিয়া ও চালক চান মিয়া জানান, অন্যান্য বছর যেখানে ১০০ মণ পর্যন্ত ধান সংগ্রহ করা যেত, এবার সেখানে ৩০ মণ সংগ্রহ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হাওরের এই ফসলি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সংগঠনের তথ্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায়ের দাবি, হাওরে প্রায় ৬০ শতাংশ ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং কৃষি বিভাগ প্রকৃত তথ্য আড়াল করছে, যার ফলে কৃষকরা সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তবে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৬ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আরও বাড়তে পারে।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222