তানবিরুল হক আবিদ :: আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বাজেয়াপ্ত। এমন বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ২০ বছরের যুদ্ধখরা কাটিয়ে একটি দেশকে কীভাবে অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের শিখরে পৌঁছাতে পারে, তা-ই করে দেখিয়ে বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেখিয়ে দিচ্ছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। যেখানে দেশটির অর্থনীতি টিকিয়ে রাখাই ছিল চ্যালেঞ্জ, সেখানে আফগানিস্তানের মসনদে বসে তালেবান সরকার দেশটির শুধু উন্নয়নই করেনি, বরং বিভিন্ন সেবাখাতে এত বড় বড় বিনিয়োগ করেছে যা রীতিমতো বিস্ময়কর।
দেশটির সরকার এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন, তাদের জন্য মাসিক নিয়মিত ভাতা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সময়ে খাদ্য ও শীতবস্ত্র বিতরণের মতো মানবিক খাতগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। একই সাথে শহীদ পরিবারগুলোর সঠিক নিবন্ধন ও পুনর্বাসন, যুদ্ধাহতদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদান এবং মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে শক্তিশালী সেতু বিনির্মাণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাবুল-কান্দাহার মহাসড়ক সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ছোট ছোট বাঁধ নির্মাণ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো নানাবিধ আধুনিক টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান প্রশাসন। এসব জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আফগানিস্তানের পুরো চিত্রই বদলে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি ইমারেতে ইসলামি আফগানিস্তানের “শহীদ ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক মন্ত্রণালয়” এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানিয়েছে, বর্তমানে তারা প্রায় ৭,০০,০০০ (সাত লাখ) এতিম, বিধবা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির সম্পূর্ণ ভরণপোষণের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করছে। আফগানিস্তানের আমীরুল মুমিনীনের বিশেষ নির্দেশনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে প্রতি বছর এই খাতে ১৮৯.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডায়নামাইট নিউজের বরাত দিয়ে আফগান মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, এতিম ও বিধবাদের এই রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি তাদের নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক ভাতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে প্রতি এতিম ও বিধবার নামে আনুমানিক ২,০০০ আফগানী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন আফগানী বিতরণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৬ সালের সরকারি রিপোর্টে দেখা গেছে, এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে বর্তমান বছরে ১২.৬ বিলিয়ন আফগানী করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত কিছুদিন পূর্বে পাকিস্তানের আকস্মিক হামলায় নিহত হওয়া সাধারণ নাগরিকদের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্বও রাষ্ট্রীয় বাইতুল মাল থেকে সম্পাদনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পাশাপাশি দেশটিতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সকল পরিবারের টেকসই পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সরকার অত্যন্ত সফলভাবে তাদের সবাইকে সম্মানজনক ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে।
ইমারতে ইসলামিয়া তালেবান সরকার যেখানেই মানুষ অসহায়ত্বের মুখোমুখি হয়েছে, সেখানেই দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে এক সময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ভিক্ষুকে ভরা এই দেশে এখন আর কোনো পেশাদার ভিক্ষুক চোখেই পড়ে না, যা বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে অবশ্যই এক বিস্ময়কর সংবাদ। সরকার ভিক্ষুকদের সুপরিকল্পিত পুনর্বাসনের দারুণ উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে রাজধানী কাবুলসহ আফগানিস্তানের প্রধান প্রধান শহরগুলো এখন পুরোপুরি ভিক্ষুকমুক্ত।
নতুন এই ব্যবস্থায় ভিক্ষুক পরিবারের ছোট শিশুদের জন্য মানসম্মত পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পরিবারের যাদের কর্মক্ষমতা ও সামর্থ্য আছে, তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে এক নীরব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন করতে চলেছে আফগানিস্তান।
ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের তালেবান সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করে বিশ্বের দরবারে এক নয়া ও অনুকরণীয় মডেল উপহার দিয়েছে। মানুষ যুগ যুগ ধরে যে ইনসাফপূর্ণ ‘সাহাব ওয়ালা’ বা ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতো, ইসলামের ইতিহাসে খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ যে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থা উপহার দিয়েছিলেন—আফগানিস্তানের বর্তমান প্রশাসন ঠিক তেমনই এক প্রোজ্জ্বল ও আলোকিত রাষ্ট্রগঠনে দৃঢ় ও তৎপর ভূমিকা রেখে চলেছে।
টিএইচএ/
