মহিউদ্দীন ফারুকী :: মাঝে মাঝে সাধারণ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় ছুটির বিষয়গুলো শুনে খুব বিব্রত হই। কষ্ট পাই। সুন্দর আখলাক ও আচরণ এবং সুলূক ও খেলাফতের নিগূঢ় রহস্য খুঁজতে থাকি।
আমার এক ছাত্র এক প্রতিষ্ঠানের উসতাজ। তার জমজ মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। স্ত্রীর প্রসবকালীন ছুটি চেয়ে পাননি। আকীকার সময় ছুটি পেয়েছেন। আসতে একদিন বিলম্ব হওয়ায় সব শিক্ষকদের সামনে মুহতামিম বললেন, “মেয়েদের একেবারে বিয়ে দিয়েই তারপর আসতেন”। কথাগুলো শুনে সকলের সামনে উসতাজ খুবই বিব্রত বোধ করলেন। লজ্জিত হলেন। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিলেন।!
এক শিক্ষকের সন্তান অসুস্থ। ছুটি চেয়ে পাননি। বলা হল, বৃহস্পতিবার যাবেন। কিন্তু মাগরিব বাদ এ সন্তান হাসপাতালেই মারা গেল। তিনি ছুটি পেলেন, তবে জীবিত সন্তানকে আর কোলে নিতে পারলেন না। সেই শিক্ষক শিক্ষকতা ছেড়ে এখন মুদি দোকান চালান।
আমার আরেক ছাত্র। এক মাদরাসায় শিক্ষক। তার সন্তান হয়েছে। প্রসবকালীন সময় ছুটি চাইলে জানানো হয়, এই সময়ে যাবেন নাকি আকীকার সময় যাবেন, সিদ্ধান্ত আপনার । শিক্ষক প্রসবকালীন সময়ে গেলেন। আকীকার সময় মাদরাসায় বসে বসে কষ্টে ভরা পোস্ট দিলেন। হয়তো তিনি মনে মনে কেঁদেছিলেন। নিজেকে বার বার বলছিলেন, এই কাজ ছাড়া কি তোমার আর কোনো কাজ নেই? এটা কেমন খেদমত যার জন্য নিজের সন্তানের আকিকার দায়িত্ব পালন করতে পারবে না? হয়ত তিনি আরও কিছু ভেবে ভেবে চোখের পানি ঝরাচ্ছিলেন!
আমি এই জায়গাতে একটু ভিন্ন চিন্তা লালন করি। আমি মনে করি, শিক্ষকরা আমার পরিবারের অংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাদের মন ভালো থাকলে পাঠদান ও আভ্যন্তরীন কার্যক্রম ভালো চলবে। তারা চিন্তামুক্ত থাকলে আনন্দ নিয়ে পড়াতে পারবে। তাই তাদের প্রয়োজনগুলো আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। তারা বলার পূর্বেই আমি আমার প্রয়োজন মনে করে ছুটি দিয়ে দিই। এক্ষেত্রে অনেকসময় আমার পূর্বে আমার আম্মুই বলেন “অমুক শিক্ষককে ছুটি দিয়ে দিও। অমুকের জন্য কিছু হাদিয়ার ব্যবস্থা করো।” কারণ, শিক্ষকদের আহলিয়াদের সাথে আমার আম্মুর মায়ের মতো সম্পর্ক। তিনি ফোন করে করে সবার খোঁজ-খবর রাখেন। সবাইকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। আলহামদুলিল্লাহ।
এক্ষেত্রে শিক্ষকরা আমার মনও রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। সময়মতো প্রায় সবাই চলে আসেন। অযথা বাইরে সময় কাটান না। অতিরিক্ত সময় বাড়িতে থাকেন না। মিথ্যা বলে ছুটি নেন না। প্রয়োজন হলে আগে থেকে বলে এক দুদিন বাড়ানোর অনুমতি থাকে। সেক্ষেত্রে অন্যান্য শিক্ষকরা নিজ থেকেই তার দায়িত্ব পালন করে দেন। আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে তাদের নিজেদের মধ্যেও একটি ভালো বোঝাপড়া আছে। একে অপরের সহযোগী হিসেবে সেই দায়িত্বগুলো তারা নিজেরাই সমাধান করেন। আমার সেক্ষেত্রে খুব অস্থির হতে হয় না। অনেক সময় আমি তদারকি করি, তবে জিজ্ঞাসা করি না।
আমি বিশেষত বিবাহ, স্ত্রী বা সন্তানের অসুস্থতা ও প্রসবকালীন সময়ে ছুটি না চাইতেই দিতে চেষ্টা করি। যেহেতু সে খবরগুলো আমি বা আমার আম্মু রাখেন। একান্তই না জানলে শিক্ষক যদি এসে জানান তাহলে সাথে সাথেই ব্যবস্থা করি। পাশাপাশি আর্থিক বিষয়গুলোও তাৎক্ষণিক খেয়াল রাখতে চেষ্টা করি।
এক শিক্ষকের স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। কয়েকদিন পর ডাক্তার তারিখ দিয়েছে। আম্মু আরও দুই সপ্তাহ আগে থেকেই খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। কখন কোথায় নিবে। কখন কি করা প্রয়োজন সে বিষয়ে আমার মাধ্যমে পরামর্শ পাঠাচ্ছিলেন। আমি গতকাল নিজ থেকেই শিক্ষককে বলে আজ সকালে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। অথচ মারকাজ ছুটি হবে আরও পাঁচদিন পর। তাছাড়া ছুটির পূর্বে গতকালই তার সাথে প্রয়োজনীয় বিষয়ে আমার ছোটভাইসহ বিস্তারিত পরামর্শ করেছি। ছোটভাইয়ের পক্ষ থেকে একটা ভালো হাদিয়া তাকে দেয়া হয়েছে।
আমি আমার জায়গা থেকে এই মাসের ফুল বেতন এবং ১০০ পার্সেন্ট বোনাস দিয়ে আজ সকালে তাকে বাড়িতে পাঠিয়েছি। ইনশাআল্লাহ।
বেতন বোনাস, আমি মনে করি সন্তান প্রসবের সময় প্রত্যেক স্বামীরই স্ত্রীর পাশে থাকা উচিৎ। স্ত্রীকে সাহস যোগাতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সে সময়ে অনেক কথা, অনেক দায়িত্ব আর অনেক সিদ্ধান্ত স্বামীকেই নিতে হয়। এই কষ্টগুলো কাছে থেকে দেখলে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হয়। সংসারের শান্তি, সুখ ও সৌন্দর্যের জন্য এটি খুব প্রয়োজন।
ছুটি, বিয়ে, আকিকা আর সিজার বা প্রসব বিষয়ে সব শিক্ষকেরই আলাদা আলাদা গল্প আছে। সে গল্পগুলো তারা লিখলেই ভালো। না লিখলেও সমস্যা নেই। আমি আন্তরিক দুআ পেয়ে যাই না চাইলেও।
আমি এতটুকু লিখেছি আমার ক্রেডিট বয়ান করতে নয়, বরং কিছু কিছু পরিচালকের অসৌজন্য আচরণ আর সাধারণ শিক্ষকদের বেদনা থেকে। পাশাপাশি সৌন্দর্য চর্চার আলোচনায় যেন সৌন্দর্য-সংস্কৃতি আরও ছড়ায় সেই প্রত্যাশায়।
লেখক : চেয়ারম্যান, আদদাওয়াহ ফাউন্ডেশন
