জেনে নিন কুরবানির আমল

by Masudul Kadir

ইসলাম ডেস্ক :: পবিত্র জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এই ১০ রাতের কসম খেয়েছেন (সুরা ফাজর : আয়াত ২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘জিলহজের
প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে অন্যকোনো দিনের আমলই উত্তম নয়।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯) বিশেষ করে যারা কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা
রাখেন, তাদের জন্য এই দিনগুলোতে সুন্নাহ ও শরিয়তের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।

১. নখ, চুল ও পশম না কাটা : জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিজের শরীরের কোনো অংশের
চুল, নখ বা পশম না কাটা সুন্নাহ। হজরত উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে
যারা কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করে, সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত নিজের চুল ও নখ না
কাটে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭; নাসায়ি: ৪৩৬৫) অধিকাংশ ফকিহর মতে এটি মোস্তাহাব বা সুন্নাহ। এই নির্দেশনা কেবল কোরবানির মূল মালিকের জন্য- পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য এটি পালন করা আবশ্যক নয়।

বিজ্ঞাপন
banner

২. জিলহজের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা : জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (স.) এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৭) এই দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের জন্য অত্যন্ত বরকতময়।

আরাফার রোজা: ৯ই জিলহজের (আরাফাহর দিন) রোজার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘আরাফার রোজা
সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম:
১১৬২) তবে যারা হজে অবস্থান করছেন (হাজি), তাদের জন্য আরাফার ময়দানে এই রোজা না রাখাই সুন্নাহ।

৩. বেশি বেশি জিকির ও তাকবির পাঠ : জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকেই ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে বেশি বেশি জিকির করা মুমিনের
কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘এই দিনগুলোতে তোমরা বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পাঠ
করো।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৪৬) আল্লাহ তাআলাও নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তারা যেন নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ
করে।’ (সুরা হজর : আয়াত ২৮)

৪. তাকবিরে তাশরিক পাঠ : ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আছর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ সালাতের পর একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা ওয়াজিব। এটি পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং মহিলারা নিচুস্বরে পাঠ করবেন।

তাকবির : আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।

৫. কোরবানি করা: জিলহজের প্রধান আমল : ১০ই জিলহজ ঈদের দিনের সবচেয়ে উত্তম আমল হলো কোরবানি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)
বলেছেন- ‘কোরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার (পশু জবাই) চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই।’ (সুনানে
তিরমিজি: ১৪৯৩) সামর্থবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবল পশু জবাই নয়, বরং ইবরাহিম
(আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতি ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের নিদর্শন। আল্লাহ বলেন- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এর গোশত ও রক্ত;
বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৭)

৬. ঈদের দিনের বিশেষ সুন্নাহ : কোরবানিদাতার জন্য ঈদের দিনের বিশেষ সুন্নাহ হলো- ঈদের সালাতের আগে কিছু না খেয়ে থাকা
এবং সালাত শেষে সম্ভব হলে নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার গ্রহণ করা। (সুনানে তিরমিজি: ৫৪২; মুসনাদে
আহমদ: ২২৯৮৪) এছাড়া সামর্থ থাকলে নিজে পশু জবাই করা অথবা জবাইয়ের সময় সামনে উপস্থিত থাকা উত্তম।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা : ভুলে নখ বা চুল কেটে ফেললে কি কোরবানি হবে? হ্যাঁ, কোরবানি হয়ে যাবে। ভুলের কোনো গুনাহ
নেই। ইচ্ছাকৃত হলে সুন্নাহ ছুটে যাবে, তবে কোনো কাফফারা বা জরিমানা নেই।

যিনি কোরবানি দিচ্ছেন না, তিনি কি নখ-চুল কাটা থেকে বিরত থাকতে পারেন?

হ্যাঁ। হাদিসে এসেছে- যারা সামর্থ্যের অভাবে কোরবানি দিতে পারছেন না, তারা যদি এই দিনগুলোতে নখ-চুল না কেটে ঈদের দিন কাটেন, তাহলে আল্লাহ তাদের পূর্ণ কোরবানির সওয়াব দান করবেন। (সুনানে নাসায়ি: ৪৩৬৫; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৮৯)

কোরবানির পশুতে আকিকা দেওয়া যাবে কি? জমহুর ফকিহগণের মতে, কোরবানির বড় পশুতে (গরু/মহিষ/উট) কোরবানির অংশের সাথে আকিকার অংশ দেওয়া জায়েজ।

পরামর্শ করার শিক্ষা : কেননা আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- হজরত ইবরাহিম আ. বললেন, হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে,
তোমাকে আমি যবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি বল? (সুরা সাফফাত : আয়াত-১০২)

হজরত ইবরাহিম আ. হচ্ছেন পিতা। তার বয়স প্রায় ৯০ বছরের মত। আর ছেলে ইসমাঈল আঃ এর বয়স ৭/৮ বছর। তিনি তার সাথেও পরামর্শ করলেন। অথচ আজকে আমারা ঘরে, বাইরে পরামর্শ করিনা। অনেক ভাই তো এমন আছেন যারা ঘরের কাজকর্মে স্ত্রী কেও জিজ্ঞেস করেন না।

একারণে ঘরে অনেক ধরনের অশান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। কোরবানি আমাদেরকে কাজে-কর্মে ছোট বড় সকলের সাথেই পরামর্শ করতে
শিক্ষা দেয়।

অধিনস্তদের দীনদার বানানোর শিক্ষা : কেননা, যখন ইবরাহিম আ. তার ছেলেকে আল্লাহর নির্দেশের কথা বললেন, তখন তিনি কত চমৎকার উত্তর দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০২)

একটু ভেবে দেখুন! হজরত ইসমাঈল আঃ এর পিতা মাতা তাকে কেমন শিক্ষা দীক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলে ছিলেন। এ ৭/৮ বছর বয়সে তিনি আল্লাহর বিধানের সামনে নিজেকে কিভাবে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। কোরবানি আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমরাও
আমাদের সন্তান ও অধীনস্তদেরকে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে এভাবে গড়ে তুলবো যেন তারা আল্লাহর বিধান মানে নিতে শতভাগ প্রস্তুত থাকে।

পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করার শিক্ষা কেনন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- অতঃপর যখন তারা উভয়ে আত্মসমর্পণ করল এবং ইবরাহিম তার পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করল। (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০৩) সুতরাং কোরবানি আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমরা পিতা পুত্রের মত আল্লাহর বিধানের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করবো।

নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকের দাবিকে উপেক্ষা করে আল্লাহর বিধান পালনে সচেষ্ট থাকব এবং জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক কে আল্লাহর
বিধান অনুযায়ী গড়তে চেষ্টা করবো।

সবর ও ধৈর্যের শিক্ষা : হযরত ইবরাহীম আঃ এবং হযরত ইসমাঈল আঃ আল্লাহর বিধান পালনের ক্ষেত্রে সবর এবং ধৈর্যের যে পরিচয় দিয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যার কারণে তারা সফলতা লাভ করেছেন। আসমানী দুম্বা পুরষ্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয় আমি এইভাবে সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার পরিবর্তে যবেহযোগ্য এক মহান জন্তু দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিলাম। (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০৫-১০৭)

সুতরাং কোরবানি আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমরা আল্লাহর বিধান  পালনের ক্ষেত্রে সবর ও ধৈযের পরিচয় দিব। তাহলে আমরাও তাদের মত পুরষ্কার পাবো। ইনশাআল্লাহ।

পশু কোরবানির সাথে সাথে নফছ নামক পশুটারও কোরবানি করবো নফছ সর্বদাই মন্দ কাজের দিকে আগ্রগামী থাকে। তাইতো হযরত
ইউসুফ আ. বলেন- আর আমি নিজকে নির্দোষ মনে করিনা, কেননা নিশ্চয় মানুষের নাফছ খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়েই থাকে; কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার রব দয়া করেন। নিশ্চয় আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা ইউসুফ : আয়াত ৫৩)

কোরবানির পশুকে যেমন ধরে, বেঁধে জবেহ করতে হয়েছে, তেমনি ভাবে আমাদের নফছকে ধরে, বেঁধে হক্কানি আল্লাহ ওয়ালার সুহবতে
নিয়ে জবেহ করতে হবে। এর সকল খারাপ চাহিদাগুলো থেকে বারন করতে হবে। নিজে নিজে এটার সংশোধন হবেনা। এর সংশোধনের জন্য আল্লাহ ওয়ালার সুহবত জরুরি।

প্রিয় মুমিন ভাই ও বোনেরা! এগুলোই কোরবানির শিক্ষা। এগুলো আমাদের মেনে চলা অতি আবশ্যক। আমরা যদি এগুলো মেনে চলতে পারি তাহলে আমাদের কোরবানি সার্থক এবং সফল হবে। অন্যথায় আমাদের কোরবানি শুধুই খোসার মতো থেকে যাবে। আল্লাহ তাআলা
আমাদেরকে এই কোরবানি থেকে শিক্ষা লাভ করার এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য সংশোধন হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন। ইয়া রব্বাল আলামিন।

জিলহজের প্রথম ১০ দিন ইবাদতের বসন্তকাল। কেবল কোরবানি দেওয়া নয়, বরং নখ-চুল না কাটা, রোজা রাখা, জিকির ও বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের এই বরকতময় দিনগুলোর প্রতিটি আমল কবুল করুন। আমিন।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222