মাগো, নুরজাহান বেগম! আমার মায়ের সাথে সাথে আপনার কথাও আজীবন মনে রাখতে বাধ্য থাকবো।
সাম্প্রতি নুরজাহান বেগম নামের এক ৭২ বছর বয়সী মাকে নিজ ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কিছু কিছু মিডিয়া বলছে, তিনি ৭ দিন আগে মারা গেছেন। কোনো কোনো মিডিয়া বলছে, ৯ দিন আগে তিনি মারা গেছেন।
সংবাদ মাধ্যম থেকে জেনেছি যে,ভবনের সিঁড়িতে একটি বিড়ালের অস্বাভাবিক চেঁচামেচির দরুণ প্রথমে মানুষের সন্দেহ হয়। এরপর দুর্গন্ধ থেকে মানুষের সন্দেহটা পাকাপোক্ত হলে এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা আসেন। ঘটনার অবশিষ্ট ধারাবাহিকতা বিভিন্ন মিডিয়া মারফত অনেকে অবগত হয়েছেন।
মারা যাওয়ার সাত দিন পর, রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা মৃত মা নূরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মরহুমা নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড.একে এম আনিসুর রহমান। বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে তাঁর কর্মস্থল মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ অফিস।
সরকারী চাকুরীতে যোগদানের পর পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
এই কর্মকর্তার মা সম্পূর্ণ অবহেলিতভাবে মারা গেলেও, তিনি নিজে ঢাকায় অবস্থিত সরকারী কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্পের উপ-পরিচালক হিসেবে এক সময় নিয়োজিত ছিলেন।
নূরজাহান বেগমের দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের [বুয়েট] কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং [সিএসই] বিভাগের একজন অধ্যাপক ও বেসরকারী প্রেসিডেন্সী ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি।
নূরজাহান বেগমের কন্যা ফাতিমা নাসরীন সুলতানা, যিনি মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা, আরেক ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।
মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত এসব সন্তান সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষ হলেও এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের সমাজকে বুঝিয়ে দিলো যে, মনুষ্যত্বের কোন স্তরে তাঁরা অবস্থান করছেন।
মা আমাদের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু। মা মানুষের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারীনী। নবীজী [সা.]একটি হাদীসে মা বাবার চারবার খেদমতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনবারই মার খেদমতের কথা বলেছেন। কুরআনে কারীম মা-বাবার শুধু খেদমত নয়, বরং তাঁদের প্রতি ইহসান ও অনুগ্রহ করার কথা বলেছে।
লক্ষ কোটি আলেম-উলামার এদেশে, বুঝমান যে কোনো মানুষ মা-বাবার মর্যাদা, সম্মান, ইজ্জত ও অধিকার সম্পর্কিত ইসলামের দিক-নির্দেশনা সম্পর্কে অবহিত। কারণ, হাজার হাজার ওয়ায মাহফিল, লক্ষ লক্ষ মসজিদ ও হাজার হাজার মাদরাসা থেকে এ বিষয়ক নানা আলোচনা চলতে থাকে বছরব্যাপী। তাছাড়া এই বিষয়ের ইসলামী প্রকাশনাও অনেক। এরপরও যা ঘটছে, তা অবজ্ঞা, উপেক্ষা, অবহেলা, অবমূল্যায়ন ও পশুত্ব ছাড়া কিছু নয়।
সরকার দয়া করে অন্তত দেশে থাকা তিন সন্তানকে মিডিয়ায় আনুন, এই করুণ ঘটনার কারণ তাঁদের মুখ দিয়েই বর্ণনা করার সুযোগ দিন। দ্রুত তাঁদেরকে আইনের মুখোমুখী করে প্রচলিত খোরপোষ আইনে যে শাস্তি হয়, সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তা কার্যকর করুন।
আমাদের আম্মা ইন্তেকাল করেছেন গত রোযার আগের রোযার তেইশতম রাত্রীতে। সেই থেকে যে কোনো বয়োবৃদ্ধ নারী দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে যায়। মনে হয়, এই জীবিত নারীর ভিতরে আমার মাও আছেন। সাধ্যমত আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আরয করি বিনীতভাবে, ‘মাগো ! আমার মার জন্য দুআ করবেন, তিনি এখন পৃথিবীতে নেই।’
বর্ণিত মা নুরজাহান বেগম এর করুণ মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর রাতে আমার ঘুম আসে না। মাতৃহারা অনেক ভাই-বোন এর অবস্থাও হয়তো এমন। অনুগ্রহপূর্বক সরকার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দ্রুত সমাধান করুন। আমাদের অশান্ত হৃদয়গুলোকে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও শান্তি দেওয়ার জন্য আপনাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি।
আমার মনে হচ্ছে, আমার মায়ের বিচ্ছেদ এর শূন্যতা এবং মা নুরজাহান বেগম এর করুণ মৃত্যু-স্মৃতি আমাকে মৃত্যু অবধি বয়ে বেড়াতে হবে।
ভালো থাকুন সকল মা, যেখানেই থাকুন। সকল মুসলিম মরহুম মা-জননী জান্নাতুল ফেরদৌস লাভ করুন,আমীন। শুভ কামনা অবিরাম, হে মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও মাতৃকুল।
হযরত মাওলানা ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ [রহ.] বলেছিলেন- মাতা,মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি, এই তিনটি পরম শ্রদ্ধার বস্তু। হে আল্লাহ! আমরা যেন এই তিনটি বস্তুর প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধাবোধ আজীবন লালন, পালন ও ধারণ করে যেতে পারি, সেই তাওফীক আমাদেরকে দান করুন, আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
লেখক : মুহতামিম ও গবেষক
