ফিলিস্তিন নিয়ে জাতিসংঘের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ চান ফিলিস্তিনের দূত

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূতের আহ্বান

by Masudul Kadir

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: জাতিসংঘের কেবল নিন্দা জানানো পর্যন্তই থাকা উচিত নয় বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের স্থায়ী প্রতিনিধি রিয়াদ মানসুর। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের স্থায়ী প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু নিন্দা জানিয়ে থেমে না থেকে, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত (অ্যানেক্সেশন) করার চলমান প্রচেষ্টা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মানসুর সোমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক দখলদারিত্ব আরও জোরদার করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল ও সংযুক্ত করার প্রক্রিয়াও দ্রুততর করেছে।

বিজ্ঞাপন
banner

তিনি সতর্ক করে বলেন, দখলদার ইসরায়েল “দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর পরিবর্তে সেটিকে আরও স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” তাঁর ভাষায়, ইসরায়েল অবৈধভাবে গাজা উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা এবং অধিকৃত পূর্ব আল-কুদস (জেরুজালেম)সহ পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশেরও বেশি অংশ কার্যত নিজের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছে।

রিয়াদ মানসুর বলেছেন, এসব পদক্ষেপ শুধু আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থীই নয়, একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত “পরিকল্পনা ও প্রস্তাব ২৮০৩”-এরও লঙ্ঘন, যেখানে দখলদারিত্ব ও ভূখণ্ড সংযুক্তির বিরোধিতা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেছেন, তেল আবিবের এই নীতি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

ইসরায়েলের অবৈধ বসতি নির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে মানসুর বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ই-ওয়ান (E1) এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা “ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র এবং এই অঞ্চলে শান্তির সম্ভাবনার জন্য মৃত্যুদণ্ডের সমান।”

আল-কুদসের (জেরুজালেম) কাছে অবস্থিত প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ই-ওয়ান প্রকল্পে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি অবৈধ বসতি ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

মানসুর আরও অভিযোগ করেন, মুসলমান ও খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে ইসরায়েল বারবার সেখানে অনুপ্রবেশ চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলাও অব্যাহত রয়েছে।

তিনি ফিলিস্তিনের কর রাজস্ব আটকে রাখার জন্যও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, এটি “শুধু অবৈধই নয়, বরং আমাদের আর্থিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ চুরিরই অংশ।” তিনি সতর্ক করে বলেন, এর লক্ষ্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া, যার গুরুতর রাজনৈতিক, মানবিক ও আঞ্চলিক পরিণতি হতে পারে।

মানসুর বলেন, আন্তর্জাতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও ইসরায়েল “আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও দ্রুত এবং আরও প্রকাশ্যভাবে” ভূখণ্ড সংযুক্তির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ঘোষণাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে।

তিনি বলেন, “ভূখণ্ড সংযুক্তি একটি যুদ্ধাপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এটি শান্তির সব প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দেয়; এটি কোনো দর-কষাকষির বিষয় নয়। এটিকে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “অ্যানেক্সেশনের নিন্দা ও প্রত্যাখ্যান জানানোর সময় শেষ হয়েছে। এখন সময় এসেছে এটিকে চিরতরে বন্ধ করার এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়াসহ অঞ্চলের সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পথ দৃঢ়ভাবে বেছে নেওয়ার, যাতে এ অঞ্চলে যৌথ নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।”

এদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ভূখণ্ড সংযুক্তির পরিকল্পনা এবং বিতর্কিত ই-ওয়ান প্রকল্প বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ইউরোপের ৪০০-র বেশি সাবেক কর্মকর্তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মানসুরের এই বক্তব্য জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্বেগের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ। সোমবার অধিকৃত পশ্চিম তীর নিয়ে প্রকাশিত তাঁর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে গুতেরেস ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণকে “নিরবচ্ছিন্ন” বলে নিন্দা জানান।

গুতেরেস বলেছেন, বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক অভিযান, বাড়িঘর ধ্বংস এবং নতুন বসতি স্থাপনের সম্মিলিত প্রভাবে ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় মাত্রায় ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। একই সঙ্গে সহিংসতা বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমিতে প্রবেশের সুযোগও সীমিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “এসব পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বকে আরও সুসংহত করছে, ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে এবং একটি পূর্ণ স্বাধীন, ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলছে।”

গুতেরেস আরও সতর্ক করেন, ই-ওয়ান এলাকায় পরিকল্পিত বসতি নির্মাণ বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এর ফলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তথাকথিত দুই-রাষ্ট্র সমাধান অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়বে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ অন্তত ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সব ধরনের বসতি স্থাপন অবৈধ। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দখলদার শক্তি অধিকৃত ভূখণ্ডে নিজেদের জনগণকে স্থানান্তর করতে পারে না। তবে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই এই নীতি লঙ্ঘন করে আসছে।

জাতিসংঘ বারবার বলেছে, ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান বাধা। কারণ এর ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে এবং একটি কার্যকর, স্বাধীন ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।
-সূত্র : পার্সটুডে

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222