৩৬ নিউজ ডেস্ক:: দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ কাটিয়ে উঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের প্রত্যক্ষ ক্ষমতায়নের এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৭ই ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি সরকার।
সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ‘১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্তি’ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এ বিশেষ মতবিনিময় সভায় সরকারের বহুমুখী অর্জন ও উন্নয়ন রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে গত ছয় মাসে সরকারের ১০টি প্রধান গণমুখী ও বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের বিস্তারিত চিত্র উন্মোচিত হয়:
১. অভূতপূর্ব জনসমর্থন ও ভাবাবেগ
বিগত দেড় দশকের ভোটাধিকারহীন অচলাবস্থা পেরিয়ে জনগণের অবিচল সমর্থনে গঠিত এই সরকারের ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং প্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি প্রমাণ করে দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
২. সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বহুদলীয় চর্চা
কোনো প্রকার রাজনৈতিক হয়রানি বা নিপীড়ন ছাড়াই দেশে পূর্ণ বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের অনুশাসন নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাণবন্ত সংসদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে শতাধিক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধকরণ অন্তর্ভুক্ত। বীরশ্রেষ্ঠদের নামে সংসদের গ্যালারি নামকরণ এবং শিক্ষার্থীদের সংসদে উপস্থিতির সুযোগ সহ ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠিত হচ্ছে।
৩. ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’, এবং ২৭ ও ৩১ দফার আলোকে প্রণীত ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রথম মন্ত্রিসభাতেই প্রায় ১৩ লক্ষ কৃষক পরিবারের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। পাশাপাশি চালু হয়েছে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসী কার্ড, জেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এবং ইমাম-পুরোহিতদের সম্মানী ভাতা। দেশজুড়ে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে ঐতিহাসিক খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
৪. সংকট মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি চালানো হয়। সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ঈদে শ্রমিক অসন্তোষ এড়িয়ে বকেয়া ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও তেলের দাম না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, প্রশ্নফাঁসমুক্ত এসএসসি পরীক্ষা আয়োজন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যা-পাহাড়ধসে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানো সরকারের বড় সাফল্য। চীনের সাথে বিনিয়োগ আলোচনা ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
৫. সর্বস্তরের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া মেটাতে ২ হাজার কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০০ থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ, ১ লক্ষ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় সংযোজন, স্কুল ড্রেস ও মিড-ডে মিল চালুর পাশাপাশি স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল চূড়ান্তের পথে। তাছাড়া ‘জুলাই জাদুঘর’ স্থাপন এবং শহীদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসনে সরকার পাশে দাঁড়িয়েছে।
৬. আর্থিক খাতের সংস্কার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
কর হ্রাস, মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ এবং শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করা হয়েছে। এর ফলে গত জুলাইয়ে সর্বকালের রেকর্ড রেমিট্যান্স এসেছে, মূল্যস্ফীতি বিগত আট মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের পথ সুগম হয়েছে।
৭. স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সেবাধর্মী পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলার পাশাপাশি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের মতো অপরাধের অভয়ারণ্য দখলমুক্ত করা হয়েছে। ওসমান হাদী ও তনু হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতিসহ শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা ‘লেভেল ২’-এ নামিয়ে এনেছে।
৮. পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন
যানজট নিরসনে পর্যায়ক্রমে এআই ট্র্যাফিক সিস্টেম, নারীদের জন্য পিংক বাস সার্ভিস এবং ২০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর কাজ চলছে। বহুপ্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে অগ্রগতি এসেছে। চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর আসিয়ান দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে। মেগা দুর্নীতির প্রজেক্ট এড়িয়ে স্কুল-কলেজে সোলার প্রোগ্রাম এবং তিনটি ‘এসডিজি ভিলেজ’ স্থাপনের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
৯. ‘সবার আগে বাংলাদেশ’: মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
অতীতের নতজানু নীতি পরিহার করে সমতা ও আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশ সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো হস্তক্ষেপের জোরালো প্রতিবাদ জানানো সরকারের স্বাধীন ও সার্বভৌম নীতির পরিচয় বহন করে।
১০. প্রধানমন্ত্রীর ভিআইপি-সংস্কৃতিহীন ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব
প্রথাগত ভিআইপি সংস্কৃতি ভেঙে সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। তৃণমূলের মানুষের মাঝে সরাসরি নেমে কোদাল হাতে খাল খনন কিংবা শিশুদের পরম স্নেহে আগলে রাখার মাধ্যমে তিনি মিতব্যয়ী ও এক ভিন্নমাত্রিক জনকল্যাণমুখী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সরকারের মুখপাত্র জানান, ১৬ বছরের ধ্বংসস্তূপ কাটিয়ে মাত্র ছয় মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান সম্ভব না হলেও সরকারের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতায় কোনো ঘাটতি নেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এই সরকারের মূল অঙ্গীকার।
