রাসুল সা. মানব জাতির সফলতার বার্তা নিয়ে এসেছেন। সফলতার মূলমন্ত্র হল, মনেপ্রাণে এই বিশ্বাস রাখা, সবকিছু করার একমাত্র মালিক আল্লাহ। সুখ-দুঃখ দেওয়ার মালিক আল্লাহ। শান্তি-অশান্তি দেওয়ার মালিক আল্লাহ। ইজ্জত দান ও বেইজ্জতি করার মালিকও আল্লাহ। দুনিয়ার কোনো পদ-পদবিতে ইজ্জত মিলবে না। বরং দুনিয়ার পদের মাধ্যমে মানুষ ধোঁকায় পড়ে। পদের মাধ্যমে ইজ্জত কামনা করা স্পষ্ট ধোঁকা। পদ-পদবির কারণে মানুষ সালাম দেয়, সম্মান করে। অথচ যাকে সালাম দেওয়া হচ্ছে, সে মনে করে, আমাকে সালাম দিচ্ছে। আরে বোকা, তোমাকে সালাম দিচ্ছে না, সালাম দিচ্ছে তোমার পদবিকে।
মানুষ গাড়িতে চড়ে আসে, সবাই তাকে সালাম দেয়। সে মনে করে, বাহ ভালোই তো, গাড়িতে চড়ে এসেছি, কত সালাম-সম্মান পাচ্ছি! তুমি বোকা, তোমাকে সালাম দেয় না। তোমার গাড়িকে দেয়, তোমার লন্ড্রী করা পরিপাটি কাপড়কে দেয়। তুমি ইজ্জতের ধোঁকার মধ্যে আছো। তোমার বাড়ি-গাড়ি শেষ হয়ে গেলে কেউ দুই পয়সার দাম দিয়েও জিজ্ঞাসা করবে না, ভাই কেমন আছেন। সালাম দেওয়া তো দূরের কথা। তখন কোনো সম্মান থাকবে না। আসলে সম্পদ, মাল, দৌলতের ভেতর প্রকৃত সম্মান নেই। আল্লাহ যাকে সম্মান দিতে চান, তাকে ছেড়া ও জীর্ণ জামার ভেতরেও সম্মান দেন।
সাহাবায়ে কেরামকে রা. দেখুন, তারা দ্বীন গ্রহণ করেছেন, ঈমান গ্রহণ করেছেন, ঈমানের কালেমা পাঠ করেছেন, আল্লাহর সব কথা বিশ্বাস করেছেন, শরিয়ত পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলেছেন, আল্লাহকে ভয় করেছেন। কেন? এজন্য যে আল্লাহ বিচার দিনের মালিক। দুনিয়াতে কত বিচার হয়ে যাচ্ছে। না না, দুনিয়ার বিচারের কথা বলা হচ্ছে না। দুনিয়ার জীবন সমাপ্তির পর আসল বিচার হবে, আমাদের রবের কাছে, আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে। সেদিন আল্লাহ তায়ালা বিচার করবেন। সেদিন দুনিয়াতে যিনি বিচার করছেন তারও বিচার হবে, দুনিয়াতে যার পক্ষে-বিপক্ষে বিচার করা হয়েছে তারও বিচার করা হবে। হাদিসে এসেছে, সমস্ত বিচারককে কেয়ামতের দিন দুই হাত বেঁধে জাহান্নামের উপরে রাখা হবে। যদি তারা দুনিয়াতে সঠিক বিচার করে থাকে, তাহলে তারা মুক্তি পাবে, নতুবা সেখান থেকে জাহান্নামে পড়ে যাবে। ৭০ বছর পর্যন্ত জাহান্নামের তলদেশে তারা যেতে থাকবে। বিচার ও পরীক্ষা তো ওখানে হবে, কারা আল্লাহকে ভয় করেছে? নবী করিম সা. সাহাবিদের অসিয়ত করেছেন, দুইজনের মাঝেও বিচার করা থেকে বেঁচে থাকো। (বোখারি, হাদিস: ৭১৫৮; মুসলিম, হাদিস: ১৭১৭) বিচার বড় ভয়ানক ব্যাপার।
আমার বন্ধুগণ! আল্লাহকে ভয় করা ঈমানের অংশ। এটার ঈমান ভেতরে আসলে, আল্লাহর ভয়ের দৃঢ় বিশ্বাস হৃদয়ে জন্ম নিলে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, সে নির্জনেও নেককার থাকে, প্রকাশ্যেও সৎ থাকে। কারণ সে বিশ্বাস করে, সব জায়গায় আল্লাহ তাকে দেখছেন। অন্ধকারেরও সে ভালো থাকে। আলোতে অনেক মানুষের সমাগম থাকে। ফলে প্রকাশ্যে মানুষের ভয়ে গোনাহ করার সুযোগ তেমন হয় না। যেন কেউ তাকে খারাপ, বদকার বলতে না পারে, এজন্য ভালো হয়ে থাকে। কিন্তু অন্ধকারে তো কেউ দেখে না। ফলে অন্ধকারে মানুষ বেশি গোনাহ করে। তার মনে যদি একথা প্রোথিত থাকে যে, আল্লাহ তার প্রতিটি কাজ দেখছেন, আল্লাহ তার সব খবর জানেন, তাহলে কি সে গোনাহ করতে পারবে? পারবে না।
মানুষ সমাজে শান্তি আনার জন্য সমাজসেবা করে, নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে। কেউ মনে করে, অনেক বেশি টাকা দিয়ে দাও, তাহলে সমাজে শান্তি শৃংখলা বিরাজ করবে। কেউ মনে করে, চাকরি দিয়ে দাও, সমাজ ভালো হয়ে যাবে। আরে ভাই, এসবে তো সমাজে প্রকৃত শান্তি আসে না। মানুষ এসবে শান্ত হয় না। মানুষ শান্ত হয় একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ভয়ে। আল্লাহর ভয় অন্তরে থাকলে কোনো পাহারাদারির দরকার নাই। পুলিশের দরকার নাই। আল্লাহর ভয় অন্তর থেকে বিদায় নিলে, শত চেষ্টা করেও মানুষকে দিয়ে ভালো কাজ করানো সম্ভব না। আল্লাহর ভয় না থাকার কারণে যে চোর চুরি করে, তার একার অপরাধে পুরো মহল্লার মানুষের অশান্তি শুরু হয়ে যায়। কখন চোর আসলো, কখন চুরি হয়ে গেল, সবার জন্য সে ত্রাসে পরিণত হয়। ঈমানের শুধু একটি শাখাই যদি মানব সমাজে এত শান্তি নিয়ে আসতে পারে, তাহলে ঈমানের সব শাখা মানলে কীরূপ শান্তি বিরাজ করবে?
ঈমানের কারণেই মানুষ আল্লাহকে খুশি করবে। অর্থ, সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি দিয়ে আল্লাহকে খুশি করা যায় না। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা নিজেদের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়, যদিও তাদের অভাব-অনটন থাকে’। (সুরা হাশর, আয়াত: ৯) নিজে পিপাসিত, প্রাণ যায় যায় অবস্থা, এরপরও পানি না খেয়ে মারা গেছেন, তুবও আরেকজনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১১-১২) এটা সাহাবায়ে কেরামের গুণ। তারা আল্লাহকে খুশি করার জন্য সব কষ্ট হাসি মুখে বরণ করে নিয়েছেন। আল্লাহর জন্যই সবকিছু করেছেন। বাঁচবো তো আল্লাহর জন্য বাঁচবো, মরবো তো আল্লাহর জন্য মরবো, এর বাস্তব চিত্র সাহাবিগণ রা. পৃথিবীকে দেখিয়ে গেছেন। সাহাবিদের এমন সোনালি সমাজ দুনিয়াতে আর কখনো দেখা গেছে? ব্যভিচারের সুযোগ আসা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর ভয়ে জিনা করেননি। বলেছেন, ‘ইন্নি আখাফুল্লাহ’ (আমি আল্লাহকে ভয় করি)। আর আমরা তো রাস্তায় পয়সা পড়ে থাকলেও তুলে আত্মসাৎ করে ফেলি!
কেয়ামতের দিন আল্লাহ বিচার করবেন। ভালো হলে পুরস্কার খারাপ হলে শাস্তি দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টি তাকে ভয় করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে না, তার সাথে বিপরীত আচরণ হবে, সমস্ত মাখলুক তাকে ভয় দেখাবে। আসমান তাকে বন্যা-বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দেওয়ার, বজ্রপাতের ভয় দেখাবে। জমিন তাকে ভূমিকম্প, অতিখরার ভয় দেখাবে। সমুদ্র ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাবে। সবাই তাকে ভয় দেখাবে। সমাজ-দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সবার চেষ্টা থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা চেষ্টা। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের চেষ্টা, কত কত বাহিনী আছে শান্তি রক্ষার জন্য, সবার চাওয়া একটিই শান্তি
এসে যাক। আরে শান্তি কোথা থেকে আসবে, কী করলে শান্তি আসবে! তাবলিগের মেহনত এটাই আপনাকে বোঝাতে চায়। এটা বোঝার জন্যই তাবলিগে আসতে হবে। এ মেহনতে কেউ যদি সহিহ নিয়তে ঈমান-আমল শেখার জন্য যায়, অবশ্যই আল্লাহ তাকে ভয় দান করবেন। তার ভেতরটা ঈমানি গুণাবলিতে ভরপুর করে দেবেন। সে তার সব কাজে আল্লাহকে রাজি-খুশি করতে চাইবে। অন্যের সাথে দোস্ত-দুশমনিও হবে আল্লাহ তায়ালার রাজি-খুশির ভিত্তিতে। শান্তি কোথায় আর আমরা খুঁজি কোথায়! কেউ যদি চট্টগ্রামে টাকা হারিয়ে এসে গুলিস্তানে খোঁজে, সে টাকা কি পাওয়া যাবে? সব মানুষ তাকে বোকা বলবে। ঠিক তেমনিভাবে শান্তি ও উন্নতি রয়েছে একমাত্র শরিয়ত মেনে চলার ভেতরে। আর আমরা শান্তি সফলতা খুঁজে চলেছি দুনিয়ার অন্যান্য কাজের ভেতরে!
অজ্ঞতার কারণে এমন বোকা হয়ে থাকি আমরা। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা ইলম নাজিল করেছেন, কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। বলে দিয়েছেন, কীভাবে চললে শান্তি খুঁজে পাওয়া যাবে। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চললে, তুমি নিজেও শান্তি পাবে, তোমার দ্বারা পুরো দুনিয়া শান্তি পাবে। ইবাদতের দ্বারা ঈমানের ভেতর শক্তি অর্জন হয়। ইলম অনুযায়ী আমল করলে ঈমান শক্তিশালী হয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘পবিত্র কালেমা তারই (আল্লাহর) দিকে আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তাকে উপরে তোলে’। (সুরা ফাতির, আয়াত: ১০) কালেমা জমিনে পাঠ করলে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। কালেমা অনেক শক্তিশালী। সরাসরি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। রকেট, নভোযানের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। রকেট-নভোযান তো আসমান ভেদ করতে পারে না। তার নির্দিষ্ট স্থান আছে। কিন্তু কালেমা সব ভেদ করে আল্লাহর কাছে চলে যায়। একটা-দুইটা না সাত মাসমান ভেদ করে উপরে ওঠে। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়, মানুষ ‘ভালো কাজের হোটেল’ বানিয়েছে। ভালো কাজের বিনিময়ে এক বেলা খানা। আরে ভাই, ভালো কাজের বিনিময়ে তো একবেলা খানা নয়, ভালো কাজের বিনিময়ে তো জান্নাতে চিরস্থায়ী খানা পাওয়া যাবে। সুবহানাল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এ দ্বীনই ইবাদত। খাওয়া, ঘুম, বিবাহ, বাচ্চা প্রতিপালন এসবই ইবাদত। সংসার চালাতে পয়সা দরকার, কিন্তু সে পয়সা উপার্জন করতে হবে সত্য পথে সৎভাবে, হারাম পথে না। সত্যিকারভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, সে তো হারামভাবে উপার্জিত কোটি কোটি টাকাও ফেলে দেবে। এই ফেলে দেওয়ার মন মানসিকতা তৈরির জন্যই তাবলিগের মেহনত। তাবলিগের মেহনত হল একনিষ্ঠ হয়ে মেহনত করার কাজ। এজন্য মুরব্বিরা বলেন, ঘরবাড়ি, পরিবার থেকে দূর হয়ে মেহনত শেখা। ঈমানের কথা শোনা, আমলের কথা বলা ও শোনা। আমল করা। চার মাস করে ধারাবাহিকভাবে মেহনত করলে নিজের ভেতরে ঈমান শক্তিশালী হবে, আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হবে। একবার একিনের সাথে আল্লাহর ভয় তৈরি হয়ে গেলে, তখন সব সময় অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে। যে ব্যক্তি অপ্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করে না, সে প্রকাশ্যেও আল্লাহকে ভয় করে না। সে মূলত প্রকাশ্যে মানুষের কারণে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকে।
-শ্রুতিলিখন: আমিরুল ইসলাম লুকমান
শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) বাদ আসর
এনএ/
