আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি

by Abid vs36

১৮ জুলাই ২০২৪, সকাল সোয়া ৯টা। সারা দেশে চলছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। আগের দিনই পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ ও ওয়াসিমসহ সারা দেশে ছয়জন নিহত হওয়ার পর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলো জোরপূর্বক খালি করে দেয় প্রশাসন। পুলিশ ও ছাত্রলীগের তাণ্ডবে রাজু ভাস্কর্য কিংবা টিএসসি—কোথাও জড়ো হতে পারছিল না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রায় অবরুদ্ধ ও দমবন্ধ করা এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের হাল ধরে রাস্তায় নেমে আসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্দান, নর্থ সাউথের তরুণ-তরুণীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান টার্নিং পয়েন্ট। ফেসবুক পেজ এবং মেসেজিং অ্যাপ ‘ডিসকোর্ড’ গ্রুপের মাধ্যমে আগে থেকেই সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল তারা।

১৮ জুলাই সকাল থেকেই রামপুরা ও প্রগতি সরণি এলাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গেটে আগে থেকেই অবস্থান নেয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ। পুলিশকে সামনে রেখেই আইডি কার্ড প্রদর্শনপূর্বক নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাস্তায় বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। শুরু হয় স্লোগান আর পাল্টা ধাওয়া। একপর্যায়ে বাড্ডায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গেট খুলে দেওয়া হলে পুলিশ বাইর থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে অবিরাম টিয়ার শেল ছুড়তে থাকে। এতে ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা মারাত্মকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষার্থীরা মুখ ও হাতে পেস্ট মেখে এবং খবরের কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করে ঝাঁজ কমানোর চেষ্টা করে। এই সংকটের মুখে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ব্র্যাকের দিকে ছুটে আসে এবং যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকা থেকে এগোতে থাকে নর্থ সাউথসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা, যা পুরো রোকেয়া সরণিকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে।

বিজ্ঞাপন
banner

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে মধ্যবাড্ডায় অবস্থিত কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে সেখান থেকেও তারা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্টসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে হাতে লাঠি নিয়ে ধাওয়া দেয় এবং কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি দখল করে নেয়। সেখানে আটকে পড়া পুলিশ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত ভবনের ছাদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দুপুরের দিকে ক্যানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করতে র‌্যাবের হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়। দুপুরের পর থেকেই সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলে চরম তথ্য বিপর্যয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

১৮ জুলাই দেশের ৪৭টি জেলায় পুলিশ, র‍্যাব, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ২৬ জনই ছিলেন শিক্ষার্থী। শুধু ঢাকাতেই প্রাণ হারান ১৯ জন। এর মধ্যে ধানমন্ডিতে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ এবং উত্তরার হাউজবিল্ডিং এলাকায় পুলিশের গুলিতে নর্দান ইউনিভার্সিটির আসিফ ও শাকিল নামের দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। অন্যদিকে বিকালের দিকে ঢাকার শাহবাগে জড়ো হওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কফিন মিছিলে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে তাঁর ভবনে অবরুদ্ধ করে রাখলে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে, যেখানে সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। সরকারি হিসাব মতেই সেদিনের সংঘর্ষে সারা দেশে দেড় সহস্রাধিক মানুষ আহত হন। একই দিন রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) কার্যালয়ে কয়েক দফায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলে সন্ধ্যার পর বিটিভির সম্প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দিনভর চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন বীরত্ব ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের গণ-আন্দোলন এক নতুন মাত্রা লাভ করে।

টিএইচএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222