আসুন গাছ লাগাই মাদরাসা প্রাঙ্গণে

মাওলানা লাবীব আব্দুল্লাহ

by Masudul Kadir

​সবুজ পাতার নিবিড় ছায়া, গাছে গাছে পাখির কলকাকলি। গোধূলিলগ্নে নীড়ে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারপাশ। বারান্দার সামনে পত্রপল্লবে ঘেরা বৃক্ষরাজি, পুকুরপাড়ে গাছের সারি। ক্লাসরুমের সামনে, আবাসিক ভবনের কোণে—সর্বত্রই যেন এক স্নিগ্ধ, দীর্ঘ ছায়ার মায়াজাল। অফিসের সামনে ফলের টব, প্রধান ফটকের মুখেও বৃক্ষের সুশীতল ছায়া। খেলার মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে ছায়াবৃত গাছ, আর পাশের পুকুরটিতে ভাসছে একটি ছোট্ট নৌকা।

​হাঁ, আমি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দারুল উলুম নিজামিয়া মোমেনশাহী’র নূরানী প্রাঙ্গণের কথাই বলছি। গাছে গাছে পাখির কলরব আর ফলে-ফুলে সুশোভিত এক সুসজ্জিত, পরিপাটি আঙিনা। ভেতরে প্রবেশ করলেই মনে হবে, আপনি কোনো মাদরাসায় নন, বরং এক সুরভিত ইলমী বাগানে পা রেখেছেন। মাদরাসার মুহতামিম (পরিচালক) মাওলানা আমিনুল হকের রুচিবোধ ও নান্দনিকতার ছাপ মিশে আছে পুরো ক্যাম্পাসে। তালগাছ থেকে শুরু করে দেশী-বিদেশী নানা জাতের ফুল ও ফলের গাছ তিনি পরম মমতায় রোপণ করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রকৃতির রূপেই অনন্য নয়, বরং ইলম ও আমলের উচ্চতর তারবিয়াহর (প্রশিক্ষণ) ক্ষেত্রেও সমাদৃত।

বিজ্ঞাপন
banner

​যাযাবরের মতো আমি দেশের হাজারো মাদরাসায় ছুটে বেড়াই। কারণ, এই আঙিনাগুলোতেই আমার হৃদয় খুঁজে পায় অনাবিল প্রশান্তি। মাদরাসা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস, আমাদের গৌরব এবং আমাদের আত্মপরিচয়।

​এমনই এক সফরে কড়া রোদের দুপুরে হাজির হয়েছিলাম ময়মনসিংহের কালিকাপুরে। সেখানে পৌঁছানোমাত্রই গাছ থেকে পেড়ে আনা তাজা লেবুর শরবত দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করা হলো। দুপুরের দস্তরখানে যে মাছ ও শাকসবজি (পেঁপে, লাউ ইত্যাদি) পরিবেশন করা হলো, তার সবই মাদরাসার নিজস্ব পুকুর এবং আঙিনায় উৎপাদিত। বিকেলে যখন মাদরাসা মসজিদের আঙিনায় গেলাম, তখন হরেক রকমের ফুল আর পাতাবাহারের বাহারি রূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। সেখানে কিছু ঔষধি গাছের বাগানও চোখে পড়ল।

​গল্পে গল্পে কেটে গেল দুপুর ও বিকেল। ১৯৮৪ সাল থেকে এই ‘কালিকাপুর হাফিজিয়া মাদরাসা’র (বেগের মাদরাসা) দরদী মালী হিসেবে এই ইলমী বাগানকে সাজিয়ে তুলেছেন ‘ছোট হুজুর’। তাঁর কণ্ঠের কুরআনের তিলাওয়াত যেন এক স্বর্গীয় মায়া তৈরি করে। তিনি নিজে ‘ছোট হুজুর’ হিসেবে পরিচিত হলেও, নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন হাজারো ‘বড় হুজুর’। তিনি মূলত হাফেজে কুরআন তৈরির এক সুদক্ষ কারিগর। এই সফল ব্যক্তিত্বের নাম হাফেজ শামসুদ্দীন। প্রায় ২৫টি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ এই মানুষটি প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর গড়ে তুলেছেন এই হিফজখানা। আল্লাহ তায়ালা দাতা ‘বেগ পরিবার’কে উত্তম জাজা দান করুন, যাঁরা এই বিশাল জায়গা ওয়াকফ করেছেন এবং এর দেখভালের দায়িত্বে রেখেছেন এই প্রকৃতিপ্রেমী কর্মবীরকে।

​মাওলানা আমিনুল হক এবং হাফেয শামসুদ্দীন—এই দুজন ‘মালী’র কথাই যদি ধরি, তাঁরা কিন্তু জীবনব্যাপী সাধনা দিয়ে তাঁদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। মাদরাসার আঙিনাকে যেমন বৃক্ষরাজিতে সাজিয়েছেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলছেন এক একজন আদর্শ, আলোকিত ও দীপান্বিত মানুষ হিসেবে।

​উন্নত পড়াশোনা ও সুস্থ মানসিকতার জন্য একটি সুন্দর ও স্নিগ্ধ পরিবেশ অপরিহার্য। দারুল উলুম নিজামিয়া মোমেনশাহী ও কালিকাপুর বেগের মাদরাসায় গেলে শরীর ও মন দুটোই সতেজ হয়ে ওঠে।

​এবার একটু আপনার আশপাশের মাদরাসাগুলোর দিকে তাকান। কাছের কিংবা দূরের কোনো মাদরাসায় গিয়ে কি এমন সবুজ, ফুলেল পরিবেশ দেখতে পান? সেখানে কি ফল কিংবা ফুলের গাছ রোপণ করা হয়েছে? হয়তো আছে, আবার হয়তো নেই।
​যদি থাকে, তবে তা অত্যন্ত আনন্দের। আর যদি না থাকে, তবে মাদরাসার পরিবেশকে সুন্দর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে আপনিও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। মাদরাসায় বিভিন্ন ফল ও ফুলের গাছ উপহার দিতে পারেন, এমনকি নিজেও সময় দিয়ে একটি সুন্দর বাগান গড়ে তুলতে পারেন।

​পরিবেশের উন্নয়নে আমাদের কিছু করণীয় প্রস্তাবনা: ​১. আঙিনার সঠিক ব্যবহার: প্রতিটি মাদরাসার খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো যেতে পারে।

​২. শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ: গাছের পরিচর্যা, পাতা ছাঁটাই ও বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব শিক্ষার্থীরাই নিতে পারে। এতে তাদের ভেতর শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও কর্মপ্রেরণা জাগ্রত হবে।

​৩. ছাদ ও টব-বাগান: শহরের যেসব মাদরাসায় পর্যাপ্ত খালি জায়গা নেই, সেখানে ছাদ-বাগান কিংবা বারান্দায় টবের মাধ্যমে (প্রয়োজনে বনসাই পদ্ধতিতে) সবুজায়ন করা সম্ভব।

​৪. ছায়াতলে পড়ার আসর : বড় গাছের নিচে বাঁশ বা পাকা আসন দিয়ে মাচাং বা বসার জায়গা তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা উন্মুক্ত বাতাসে ‘মুতালায়া’ (অধ্যয়ন), জিকির ও ইলমী সাধনা করতে পারবে।

​৫. কৃষিভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষা : মাদরাসায় পর্যাপ্ত জমি থাকলে মৌসুমী শাকসবজি চাষ করা যেতে পারে। এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা অলসতা কাটিয়ে পরিশ্রমী ও জীবনঘনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

​আমাদের মাদরাসাগুলোতে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। তবে হ্যাঁ, সবার আগে পড়াশোনা ও তারবিয়াহর মান উন্নত করতে হবে, তারপর পরিবেশের সৌন্দর্য। কারণ, শুধু বাগান তো যেকোনো জায়গাতেই করা যায়, কিন্তু মাদরাসা হলো মূলত জান্নাতের বাগান (বাগে জান্নাত)। আসুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও নির্দেশনার আলোকেই আমরা আমাদের ইলমী কাননগুলোকে সাজিয়ে তুলি।

​বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে হাদীসে নববীর নির্দেশনা : ​বৃক্ষরোপণ ও প্রকৃতির পরিচর্যাকে ইসলামে কেবল দুনিয়াবী কাজ নয়, বরং বড় ইবাদত ও সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস নিচে দেওয়া হলো:

​১. সদকার সওয়াব লাভ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ লাগায় অথবা ক্ষেতখামার করে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু কিছু আহার করে, তবে তার বিনিময়ে লেখক বা রোপণকারীর আমলনামায় একটি সদকার সওয়াব লিপিবদ্ধ হয়।” (সহীহ বুখারী,)

​২. শেষ মূহূর্তেও গাছ লাগানোর তাগিদ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, “যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত চলে আসে, আর তোমাদের কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয় (যদি রোপণ করার মতো সময় সে পায়)।” (মুসনাদে আহমাদ, আল-আদাবুল মুফরাদ)

লেখক : পরিচালক, ​ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222