৩৬ নিউজ ডেস্ক: কওমী মাদরাসাকে কেন্দ্র করে চলমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার, অপতথ্য বিস্তার এবং মব প্রতিরোধের লক্ষ্যে কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হাইআতুল উলয়া ও কওমী মাদরাসার সবচেয়ে বড় শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার বাংলাদেশের কাছে একগুচ্ছ সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা পেশ করেছে ‘সচেতন আলেম সমাজ’।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত হাইয়াতুল উলইয়ার প্রধান কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে এই ১২ দফা প্রস্তাবনা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। এই প্রস্তাবনায় দেশের মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট হিসেবে তথ্যগত শূন্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পাদিত ভিডিওর মাধ্যমে তৈরি করা ডিজিটাল মব এবং একপেশে মিডিয়া ট্রায়ালকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রস্তাবনা পেশের সময় সচেতন আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য না আসায় গুজবের বিস্তার ঘটে এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করার প্রবণতা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে সচেতন আলেম সমাজ বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, মাদরাসাগুলো নিয়ে বর্তমানে যে সকল ঘটনা বা অভিযোগ সামনে আসছে, তার অনেকগুলোই অপপ্রচার এবং ভিত্তিহীন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে তারা নিজেরাও গুরুত্বের সাথে ভাবছেন এবং সংশ্লিষ্ট মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মাদরাসায় যদি বাস্তবিকই কোনো অপকর্ম বা নৈতিক স্খলনজনিত ঘটনা ঘটে, তবে তা কোনোভাবেই ধামাচাপা দেওয়া বা গোপন করা যাবে না। বরং এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই কঠোর অবস্থানের মূল উদ্দেশ্য হলো, মুষ্টিমেয় কয়েকজনের অপরাধের দায়ে যাতে ঢালাওভাবে পুরো মাদরাসা সমাজ বা কওমী শিক্ষা ব্যবস্থাকে অভিযুক্ত করার সুযোগ কেউ না পায়। যেকোনো অপরাধ বা অপকর্মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, সাংগঠনিক তৎপরতা প্রসঙ্গে আল-হাইআতুল উলয়ার অফিস ব্যবস্থাপক মু. অছিউর রহমান জানান, পরিস্থিতির উন্নয়নে জেলা সফরের মতো কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও তা সম্পন্ন করতে সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।
মাদরাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সচেতন আলেম সমাজ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা উল্লেখ করেছে। উক্ত প্রস্তাবনায় সকল শিক্ষকের তথ্য সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও সমন্বিত ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত ও চারিত্রিক যোগ্যতার বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া অনৈতিক বা অপরাধমূলক কাজে দোষী সাব্যস্ত শিক্ষকদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকলিস্ট প্রণয়ন, মাদরাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদে নিবন্ধন ও নবায়ন ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে একাডেমিক ও আবাসিক কার্যক্রমের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের জন্য শিশু সুরক্ষা ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং একটি কেন্দ্রীয় রিসার্চ সেন্টার স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে সকল মাদরাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন, অভিযোগ গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মনিটরিং সেল গঠন এবং শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালুর দাবি জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের আইনি সহায়তা প্রদান এবং মহিলা ও হিফজ মাদরাসাগুলোর জন্য পৃথক নীতিমালা তৈরির প্রস্তাবনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মাদরাসার সাধারণ স্থানগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ এবং স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। অপপ্রচার মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী প্রেস উইং গঠন এবং সাইবার মনিটরিং টিমের মাধ্যমে গুজব শনাক্ত করে দ্রুত সঠিক তথ্য প্রচারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবনা পেশকারী প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন মুফতি মহিউদ্দীন ফারুকী, মাওলানা রুহুল আমীন সাদী, মুফতি আবু মুহাম্মাদ রাহমানী, মুফতি আদনান মাসউদ, মাওলানা শফিকুল ইসলাম ইমদাদী রাহাত, মুফতি আ ফ ম আকরাম হুসাইন, মুফতি আফফান বিন শরফুদ্দীন, মুফতী আবদুল্লাহ তামিম, মাওলানা রাকিবুল ইসলাম রইস এবং মাওলানা আবদুল গাফফার। তারা সম্মিলিতভাবে আশা প্রকাশ করেন, এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে কওমী মাদরাসাগুলোর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিকল্পিত অপপ্রচার রুখে দেওয়া সহজ হবে।
টিএইচএ/
