নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের বেসরকারি মাদরাসা, বিশেষ করে কওমি মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে যাচাইবিহীন ও একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ না করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনটি বলেছে, কোনো অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।
রোববার (৫ জুলাই) বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সংস্থা বাংলাদেশের মহাসচিব শায়েখ সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কওমি মাদরাসাগুলো যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সমাজসেবা ও দেশপ্রেম গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্য বিশ্বমঞ্চে দেশের জন্য বারবার গৌরব বয়ে এনেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মাদরাসা ও মাদরাসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অসম্পূর্ণ ও একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত বা পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে। অতীতে এমন বহু ঘটনায় প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হলেও পরবর্তীতে আইনি তদন্তে সেসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত বলে প্রমাণিত হয়েছে। দুঃখজনক হলো, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সেই সংবাদগুলো গণমাধ্যমে পরবর্তীতে আর সমান গুরুত্বে প্রচার পায় না। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত, কিন্তু যথাযথ তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে কাউকে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা অনুচিত।
এই পরিস্থিতি নিরসনে গণমাধ্যমের প্রতি ৫ দফা আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে—সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য-প্রমাণ সঠিকভাবে যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বসহ গ্রহণ করা, একপাক্ষিক প্রচারণা থেকে বিরত থাকা, তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তা সমান গুরুত্বে প্রকাশ করা এবং সর্বোপরি দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, কোনো অভিযোগ শুনেই হুট করে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে হবে এবং যাচাই ছাড়া কোনো ধরনের গুজব বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি দেশের সব মাদরাসার মুহতামিম, পরিচালক ও শিক্ষকদের প্রতি নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মাদরাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন, শিশু সুরক্ষা ও নৈতিকতা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতি সব সময় মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, দেশের মাদরাসাগুলোর মর্যাদা, সুনাম ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে শীর্ষস্থানীয় মাদরাসা পরিচালকদের সমন্বয়ে এই ‘বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে। পরিষদের পক্ষ থেকে আগামী ৩০ জুলাই রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে একটি জাতীয় সম্মেলনের আয়োজনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়। উক্ত সম্মেলনে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও হয়রানির শিকার হওয়া শিক্ষক ও মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে দেশের সর্বস্তরের সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের এই জাতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন হুফফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সভাপতি শায়েখ ক্বারী আবদুল হক, মারকাযুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনালের প্রিন্সিপাল শায়েখ ক্বারী নেসার আহমদ আন-নাসেরী, মারকাযুল ফুরকান শিক্ষা পরিবারের প্রিন্সিপাল মাওলানা মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ, গাজীপুরের মাদরাসাতুস সাত্তার দারুল উলুমের সদরে মুহতামিম মাওলানা ক্বারী সাইদুল ইসলাম আসাদ, আর রায়হান ইন্টারন্যাশনালের প্রিন্সিপাল মুফতি আবদুল কাইয়ুম মোল্লা, ডেমরার মাদরাসাতু আহমদের পরিচালক মাওলানা জোবায়ের আহমদ, কামরাঙ্গীরচর জামিয়া আরাবিয়ার মুহতামিম মাওলানা আব্দুর রহমান মৃধা, মাদরাসাতুল কোরআনের প্রিন্সিপাল মাওলানা ক্বারী ইলিয়াস লাহোরী, গুলশানের মাদরাসা নূরুননবীর মুহতামিম মাওলানা কাওসার আহমদ রাহমানী, নারায়ণগঞ্জের জামিরিয়া ইন্টারন্যাশনালের প্রিন্সিপাল মুফতি আবু সাঈদ, উত্তরখানের দারুত তাকওয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা তাজুল ইসলাম, উত্তরার আশরাফুল মাদারিসের প্রিন্সিপাল মাওলানা সালমান রহমান, বায়তুন নূর ইসলামিয়ার প্রিন্সিপাল মুফতি আমির আহমদ রহমানী, উত্তরার আর রহমান ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল মাওলানা আশরাফ সাফিন, মাদারীপুরের বাইতুল কোরআন মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সুলাইমান নোমান তাফহীম এবং চকবাজার মদীনাতুল হুফফাজ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সুলাইমান ঢাকুবীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম।
টিএইচএ/
