‘গুডবাই, প্রিয় বাংলাদেশ! ফেলে যাচ্ছি প্রিয় মাতৃভূমি, হৃদয়ে নিয়ে অগণিত স্মৃতি আর একরাশ আবেগ। গন্তব্য এবার পবিত্র হারামাইনের পুণ্যভূমি। আল্লাহ চাহেতো আবারও দেখা হবে ইন-শা-আল্লাহ।’
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে দেশ ছাড়ার প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন আবেগঘন বার্তা ছড়িয়ে লিখেছিলেন তরুণ আলেম মাওলানা মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ বদরপুরী।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আর কখনোই প্রিয় মাতৃভূমিতে ফেরা হলো না তাঁর। আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ জিয়ারতের আকুল বাসনা বুকে নিয়ে ইহরাম পরা অবস্থায় রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের বর্বরোচিত মিসাইল ও ড্রোন হামলায় শাহাদাতবরণ করেছেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফরেনসিক ডেথ সার্টিফিকেট ও বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রের মাধ্যমে তাঁর শাহাদাতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তাঁর এই মর্মান্তিক ইন্তেকালের খবরে দেশের বাড়িতে স্বজনদের মাঝে নেমে এসেছে শোকাচ্ছন্ন এক পাহাড়সম স্তব্ধতা ও কান্নার রোল।এক পলকে স্বপ্নের সফর থেকে ট্র্যাজেডি:কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের সন্তান মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরপুরী ছিলেন লালবাগ জামেয়ার সাবেক প্রখর মেধাবী শিক্ষার্থী এবং ঢাকার কামরাঙ্গীরচর জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসার সম্মানিত শিক্ষাসচিব।
৪৫ জনের একটি আলেম ওমরাহ কাফেলার সঙ্গে শনিবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের ফ্লাইটে রিয়াদের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। আকাশপথে ৩১ হাজার ৮৪৬ ফিট উঁচুতে অবস্থানকালে ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন, ‘স্বপ্নের দিকে! একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি… জীবনের সেরা সফরের এই মুহূর্তগুলো সত্যিই অন্য রকম, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়!’
রিয়াদে নেমে দুপুরের দিকে কাফেলার ছবিসহ তিনি শেষবারের মতো জানান, “আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের কাফেলা নিরাপদে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। জীবনের সেরা সফরের পথে প্রতিটি মুহূর্ত কাটুক মহান রবের অশেষ রহমত ও মেহেরবানিতে…” কিন্তু সেই নিরাপত্তার আনন্দ স্থায়ী হয়নি আধ ঘণ্টাও।
দুই ঘণ্টার ট্রানজিট শেষে যখন তারা মক্কার উদ্দেশ্যে জেদ্দাগামী বিমানে ওঠার রেইলিংয়ে পা রাখেন, ঠিক তখনই আকস্মিক এক মিসাইল সরাসরি আঘাত হানে।
মুহূর্তের মধ্যেই বিকট বিস্ফোরণে চারপাশ ধোঁয়া ও রক্তে ভেসে যায়, এবং সেখানেই শাহাদাতবরণ করেন ইহরাম পরিহিত মাওলানা নাসরুল্লাহ।
অসহায় তিন শিশু সন্তান ও শোকস্তব্ধ পরিবার:মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরের ইন্তেকালে দেশে অবস্থানরত তাঁর পরিবারে এখন শুধুই বুকফাটা মাতম।
ঘরে তাঁর বয়োবৃদ্ধ বাবা মাওলানা মোহাম্মদউল্লাহ এবং মা জাহানারা বেগম সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বামী হারানোর বেদনায় দিশেহারা স্ত্রী মাহবুবা।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে তাঁর অবুঝ তিন শিশুর মুখে। বড় ছেলে (৭ বছর), মেজো মেয়ে (৫ বছর) এবং মাত্র ২ বছরের ছোট ছেলেটি এখনো বুঝে উঠতে পারছে না তাদের স্নেহের বাবা আর কোনো দিন তাদের কোলে টেনে নেবেন না।
বাইতুল্লাহর মেহমান হতে যাওয়া বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকা শিশুদের নিষ্পাপ চাহনি সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষের চোখে জল এনে দিচ্ছে।
শোকের ছায়া আলেম সমাজে:
মাওলানা নাসরুল্লাহর হঠাৎ শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশের আলেম সমাজ, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হকসহ দেশের শীর্ষ আলেমরা তাঁর শাহাদাতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন।
একই কাফেলায় থাকা কামরাঙ্গীরচর মাদ্রাসার বেশ কয়েকজন শিক্ষক গুরুতর আহত অবস্থায় রিয়াদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় পুরো দেশ আজ শোকাহত।স্বজনরা এখন অপলক চোখে চেয়ে আছেন—অন্তত প্রিয় মানুষটির মৃতদেহটি শেষবারের মতো দেখার জন্য যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
