শিক্ষা ও মানবসেবার অন্যতম প্রতিষ্ঠান আল-মারকাজুল ইসলামী

by Fatih Work

বর্তমানে বাংলাদেশে ‘মাদরাসা শিক্ষা’ কেবল ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি বরং এটি আধুনিক সমাজ গঠনের একটি অন্যতম মাধ্য়ম হয়ে উঠেছে। এই ধারায় আল-মারকাজুল ইসলামী এমন প্রতিষ্ঠান যা একদিকে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে, অন্যদিকে মানবকল্যাণ ও সমাজসেবায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আল-মারকাজুল ইসলামীর অধিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১২ টি মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী (অন্ধ) মাদরাসা’- আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)। হাফেজ মাওলানা মুফতি শহিদুল ইসলাম (রহ.) এর উদ্যোগে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় এই সংগঠন, যা বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ দাওয়াহ ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ‘শিক্ষা, সেবা, আত্মশুদ্ধি ও দাওয়াহ,’ এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আল-মারকাজুল ইসলামী কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠাতা: আলোকিত দাঈ আরেফ বিল্লাহ শাহ হাকীম মুহাম্মদ আখতার (রহ.) যিনি সমাজসংস্কারক হিসেবেও পরিচিত। এবং খলীফা হাফেজ মাওলানা মুফতি শহিদুল ইসলাম (রহ.) ছিলেন একইসাথে আলেম, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। তার হাতে গড়া আল-মারকাজুল ইসলামী এখন হাজারো মানুষের প্রেরণা ও আস্থার নাম।
তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি সংগঠন গড়ে তোলা যেখানে কুরআনের শিক্ষা ও সমাজসেবা একসঙ্গে চলবে। তার সেই স্বপ্ন ভিত্তিতে কেরাণীগঞ্জে সংস্থাটির একাডেমিক সিটি নির্মাণ হয়েছে। যেখানে কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস মাস্টার্স সমমান, ইসলামী আইন ও গবেষণা এবং আরবি সাহিত্য বিভাগ চালু রয়েছে। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, উন্মুক্ত ১০ তলা বিশিষ্ট লাইব্রেরী ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন
banner

আধুনিক ও ঐতিহ্যের সমন্বয়: এই সংগঠনের পরিচালিত মাদরাসাগুলোতে কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স সমমান দাওরায়ে হাদীস, ইফতা বা ইসলামী আইন ও গবেষণা, আদব বা আরবি সাহিত্য পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণও রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় আল-মারকাজুল ইসলামী: ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত Al-Markajul Islami Hospital বর্তমানে অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সজ্জিত। এখানে দরিদ্র রোগীদের জন্য ফ্রি ও সবার জন্য সল্পমূল্যে চিকিৎসা ও এ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া হয়।

মানবতার সহায়তায় আল-মারকাজুল ইসলামী: এটি শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়— এটি একটি মানবকল্যাণ সংস্থা। করোনা মহামারীর সময় সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছে হাসপাতাল, এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, বন্যা ও দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রম, কুরবানী প্রজেক্ট, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মাদরাসাসহ মোট ১২ টি মাদরাসা, রোহিঙ্গা পূনর্বাসন, দাফন-কাফন ও জানাজা সেবা ইত্যাদি কর্মসূচি।

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: আল-মারকাজুল ইসলামী ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম অন্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা চালু করেছে। তাদের জন্য আলাদা আবাসিক বিভাগ চালু রয়েছে। সেখানে ব্রেইল পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা, অডিও পাঠ ও হাফেজি প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যেই অনেক শিক্ষার্থী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতায় সফলতা অর্জন করেছে। এটি বাংলাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাসে এক অন্যতম উদাহরণ।

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জীবনে আল-মারকাজুল ইসলামী: অন্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস অর্জন করে সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই হাফেজ, ক্বারী, এমনকি শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ‘অন্ধত্ব নয়, অজ্ঞতাই আসল অন্ধত্ব।’ এই নীতিবাক্যকে সামনে রেখে তারা ইসলামী শিক্ষাকে দৃষ্টিহীনদের জন্যও সহজলভ্য করেছে। ইতোমধ্যে ৫০০ এরও অধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এখান থেকে হিফজ সম্পন্ন করেছে।

নারীদের সহায়তা: প্রতিষ্ঠানটি ‘আল-মারকাজুল ইসলামী মহিলা শাখা’ নামে আলাদা বিভাগ পরিচালনা করছে। এখানে প্রতিবছর ১৫০০ নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামী শিক্ষা, দাওয়াহ প্রশিক্ষণ, সেলাই-কাটিং ও হস্তশিল্প কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

সমাজগঠন ও দাওয়াহ কার্যক্রম: ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে আল-মারকাজুল ইসলামী নিয়মিত সেমিনার, দাওয়াহ প্রোগ্রাম, ইমাম ও কওমী শিক্ষক প্রশিক্ষণ আয়োজন করে থাকে। তাদের অধীনে পরিচালিত ‘ইমাম ও খতিব প্রশিক্ষণ একাডেমি’ দেশব্যাপী ধর্মীয় নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেবা ও সম্পর্ক: সংগঠনটি বর্তমানে বাংলাদেশেই নয়, বাইরের দেশেও সেবা প্রদান করছে। আমেরিকার নিউইয়র্কে এর ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কওমী মাদরাসা তুরস্ক, আফগানিস্থানসহ বিভিন্ন দেশের দূর্যোগে ত্রাণ সহযোগিতা পাঠিয়েছে তারা।

ত্রাণ ও দুর্যোগ সহায়তা: সংগঠনটি বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও শীতে বস্ত্র বিতরণ করে। প্রতিটি দুর্যোগেই আল-মারকাজুল ইসলামী তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে মাঠে থাকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো যেমন: ফেনী, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, বান্দরবনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তারা সেবা প্রদান করছে।

মিডিয়া ও প্রকাশনা বিভাগ: আল-মারকাজুল ইসলামী নিয়মিত ‘আল-ইহসান’ নামক ইসলামী পত্রিকা প্রকাশ করতেন। বর্তমানে সাময়িকভাবে এর প্রিন্ট বন্ধ থাকলেও অনলাইন কনটেন্ট প্রকাশ করে। বিশেষ করে ওয়েবসাইট, ইউটিউব ও সামাজিক মাধ্যমে তাদের দাওয়াহ বার্তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

এমএআর/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222