মো. নিজাম উদ্দিন স্বাধীন (স্টাফ রিপোর্টার)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত’ একটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে প্রার্থী করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে জামায়াতের ইসলামী পক্ষ থেকে প্রার্থী হওয়ার জন্য ‘সংকেত পেয়েছেন’ বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দী। তিনি দলটির হিন্দু শাখার ডুমুরিয়া উপজেলা কমিটির সভাপতি। যদিও সেখানে জামায়াতে ইসলামী আগেই তাদের এক নেতাকে প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছে এবং তিনি সেখানে প্রচারও চালাচ্ছেন। দলটি এখন বলছে, “কৃষ্ণ নন্দীর প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কৃষ্ণ নন্দীর প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি খুলনার ডুমুরিয়া, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা- এই তিন উপজেলাতেই রাজনৈতিক মহল ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।”
স্থানীয়রা জানান, “জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই নেতার বাড়ি ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে। সেখানে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কৃষ্ণ নন্দী ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামী হিন্দু শাখার নেতা হন এবং সেখানে দলের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে তাকে দেখা গেছে।”
সম্প্রতি ডুমুরিয়া উপজেলার এক সভায় কৃষ্ণ নন্দী ৩৬নিউজকে বলেন, “আমি ২০০৭ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘ সময়ে সদস্যদের দুঃখ-কষ্টে পাশে থেকেছি। গেল আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। দেড় বছর আগে ডুমুরিয়ায় দলের হিন্দু শাখার সভাপতির দায়িত্ব পাই।”
কৃষ্ণ নন্দীর বাড়ি ডুমুরিয়া উপজেলায় হলেও তাকে প্রার্থী করার কথা চলছে পাশের দাকোপ-বটিয়াঘাটা আসনে। কারণ, ডুমুরিয়া-ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। অবশ্য খুলনা-১ আসনে বটিয়াঘাটা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির শেখ আবু ইউসুফকে আগেই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি সেখানে প্রচার চালাচ্ছেন।
দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন পেতে হলে প্রার্থীকে ন্যূনতম ‘রুকন’ হতে হয়। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসলাম ধর্মের বাইরেও প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি দলের মধ্যে আলোচনায় আছে। সেক্ষেত্রে আসন্ন নির্বাচনে কিছু আসনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মনোনয়ন দেওয়ার ‘বাস্তবতা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, খুলনা জেলার সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান মিজান। তিনি বলেন, “চলতি মাসের ১৫-১৬ তারিখের দিকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কিছু এলাকায় আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও উপজাতি প্রার্থী দেব। সেই আলোকে কৃষ্ণ নন্দীর বিষয়ে কিছু কথাবার্তা চলছে। কেন্দ্র থেকে আগেই আমাদের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কথা রয়েছে, পরবর্তীতে দল প্রার্থী পরিবর্তন করতে পারবে।”
প্রার্থিতার বিষয়ে দল থেকে ‘ইতিবাচক সংকেত’ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন কৃষ্ণ নন্দী। তিনি বলেন, “দল খুলনা-১ আসনের জন্য আমাকে কিছুটা নিশ্চিত করেছে। দল যদি আমাকে প্রার্থী ঘোষণা করে, তাহলে আমি প্রার্থী হব। আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি। দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর নির্বাচনি এলাকায় যাব।” অন্য আসনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “খুলনা-১ আসনে নিজের বাড়ি না থাকলেও সেখানে তার অনেক স্বজন রয়েছেন।”
এদিকে খুলনা-১ আসনে প্রচার কাজ চালানো বটিয়াঘাটা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আবু ইউসুফ বলেন, “প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকে আমি নির্বাচনি এলাকায় প্রচার চালাচ্ছি। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়ে কেন্দ্র আমাকে এখনো কিছু জানায়নি। সংগঠন অন্য কাউকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিলে তিনিই নির্বাচন করবেন। তবে এখানে অন্য কাউকে চূড়ান্ত করা হয়েছে কিনা, তা আমি জানি না।”
ভাবছি কিন্তু ‘সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি’
খুলনা-১ আসনটি হিন্দু অধ্যুষিত। জামায়াত নেতা শেখ আবু ইউসুফ ১৯৯৬ সালে এখান থেকে ভোট করেন। পরের পাঁচটি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এখানে আর কোনো প্রার্থী দেয়নি। তিন দশক পর আবার সেখানে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের প্রচার চালাচ্ছে।
দলটির নেতাকর্মীরা জানান, “প্রথম দফায় খুলনা-৪, খুলনা-৫ ও খুলনা-৬ আসনে প্রাথমিকভাবে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাকি তিন আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি। এর মধ্যে খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে শেখ আবু ইউসুফের নাম ঘোষণা করা হয়।”
ডুমুরিয়া-ফুলতলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসনও হিন্দু অধ্যুষিত। এক বছর ধরে ডুমুরিয়া ও ফুলতলায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে কৃষ্ণ নন্দীকে দেখা গেছে। তার নেতৃত্বে প্রতিটি সমাবেশেই সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষদের সরব উপস্থিতি ছিল। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “হিন্দু কমিউনিটির রিপ্রেজেন্ট করতে পারে, উপজাতিদের রিপ্রেজেন্ট করতে পারে- এমন অনেকে যোগাযোগ করছেন। খুলনা, কিশোরগঞ্জসহ আরো কয়েকটি জেলা থেকে এমন যোগাযোগ হচ্ছে। খুলনা থেকে অনেকে কৃষ্ণ নন্দীর নাম বলছেন। দলের আমিরসহ আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি কিন্তু সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।”
‘কৌশলী’ জামায়াত
দাকোপ দেশের একমাত্র হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজেলা। এখানে ৫৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাসিন্দাই হিন্দু। এ ছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী আছে ২ দশমিক ১২ শতাংশ। বাকি ৪৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ বাসিন্দা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। আর বটিয়াঘাটা উপজেলার ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাসিন্দা হিন্দু ধর্মের। এই আসনটিতে ১৯৯১ সাল থেকে টানা জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থীও এখানে কখনো সুবিধা করতে পারেননি। জামায়াতের প্রার্থী শেখ আবু ইউসুফ ১৯৯৬ সালে এই আসনে পেয়েছিলেন ২ হাজার ৩০৮ ভোট, যা মোট ভোটের মাত্র দুই শতাংশ।
জামায়াতের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হলে তারা ধারণা দেন, “আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। এ কারণে দলটির ঘাঁটিতে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে হিন্দু ধর্মের একজনকে প্রার্থী ঘোষণা করতে চায় জামায়াত।”
খুলনা-১ আসনে ১৯৯১ সালের পর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচন ছাড়া বিএনপি কখনো জেতেনি। এখানে সব সময় আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র হিসেবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থী জিতেছেন। একসময় বামপন্থি দলের প্রভাব থাকলেও জামায়াতের অবস্থান সব সময় দুর্বল ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা বেড়েছে। এখানে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে এখানে দলীয় প্রার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা জিয়াউর রহমান (পাপুল), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা পার্থ দেব মণ্ডল গণসংযোগ করছেন। বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষে দাকোপ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান কিশোর কুমার রায়ও আলোচনায় আছেন।
১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখনকার খুলনা-১ আসনটি খুলনা-৫ নামে ছিল। স্বাধীনতার পর এ আসনে প্রথম সংসদ সদস্য হন কুবের চন্দ্র বিশ্বাস। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পান প্রফুল্ল কুমার শীল। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জেতেন প্রফুল্ল কুমার মণ্ডল।
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে জয়ী হন শেখ হাসিনা। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান শেখ হারুনুর রশিদ। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন পঞ্চানন বিশ্বাস। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের টিকেটে আবার জয়ী হন পঞ্চানন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আবার সংসদ সদস্য হন পঞ্চানন বিশ্বাস। ২০২৪ সালে জয়ী হন ননী গোপাল মণ্ডল।
এমএআর/
