আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং বিধ্বংসী বোমা হামলার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে আরও নতুন সেনাদল পাঠিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের ভূখণ্ডে নিজেদের সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং চলমান স্থল অভিযানের পরিধি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে তেল আবিব। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তথাকথিত ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৬২ নম্বর ডিভিশনের সেনারা এখন দক্ষিণ লেবাননে কাজ করবে। এই শক্তিশালী ডিভিশনটি আগে থেকেই সেখানে মোতায়েন থাকা আরও দুটি ডিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের সামরিক কার্যক্রম জোরদার করছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে দক্ষিণ লেবাননে একটি বড় আকারের ‘বাফার জোন’ তৈরির পরিকল্পনা করছে তাদের সামরিক বাহিনী। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে মার্চ মাসের শুরু থেকেই লেবাননে পূর্ণমাত্রার সামরিক আক্রমণ জোরদার করে ইসরায়েলি বাহিনী। তবে এই সংঘাতের ফলে লেবাননে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, মার্চের শুরু থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ১১৬ জন নিহত এবং ৩ হাজার ২ ২৯ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের এই স্থল অভিযান আরও বিস্তৃত হলে এক ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ নেমে আসবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও কানাডার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ লেবাননের সার্বভৌমত্বের ওপর চরম হুমকি এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ বিষয়ে লেবানন সরকার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেবে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস অপরাধের ধারাবাহিকতা এখন লেবাননের বাড়িঘর ও সেতু ধ্বংসের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। সংস্থাটি বিশ্বনেতাদের প্রতি ইসরায়েলের এই বেআইনি ধ্বংসযজ্ঞ থামানোর আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এ সপ্তাহে ঘোষণা করেছেন যে, দখলদার শত্রুর বিরুদ্ধে তারা ‘সীমাহীন’ লড়াই চালিয়ে যাবেন। বৃহস্পতিবার হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ৪৫টিরও বেশি সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে। এর মধ্যে সীমান্ত শহর দেইর সিরিয়ানে দুটি মেরকাভা ট্যাংকসহ বেশ কিছু সাঁজোয়া যান ধ্বংসের কথা জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মতে, হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় ইসরায়েলের উপকূলীয় শহর নাহারিয়ায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ লেবাননে এক ‘দুর্ঘটনায়’ তাদের এক সেনা নিহত ও চারজন আহত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সাফ জানিয়েছেন, উত্তর ইসরায়েলের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের ঘরে ফিরতে দেওয়া হবে না।
টিএইচএ/
