‘দেশপ্রেম আর উপাসনা এক নয়’: বন্দে মাতরম নিয়ে তীব্র প্রতিবাদে শীর্ষ আলেমরা

by hsnalmahmud@gmail.com

চিফ রিপোর্টার:: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস শুরুর আগে ‘বন্দে মাতরম’ গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে একাধিক মুসলিম সংগঠন ও নেতৃবৃন্দ। তারা একে সংবিধানবিরোধী এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দেন, আগামী সোমবার থেকে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস শুরুর আগে প্রার্থনা সঙ্গীতের সময় ‘বন্দে মাতরম’ গান গাইতে হবে। তিনি জানান, শিগগিরই এ সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।

বিজ্ঞাপন
banner

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে আগেই বার্তা পাঠানো হয়েছে যে, সরকারি বিদ্যালয়ে প্রার্থনার সময় ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতেও সেই নির্দেশনা পৌঁছাতে শুরু করেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়নি।

বিধানসভা চত্বরে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমি নবান্নে যাব। সব বিদ্যালয়ে সোমবার থেকে বন্দে মাতরম গেয়ে বিদ্যালয় (ক্লাস) শুরু করতে হবে। সেই নোটিশটা জারি করব।’

তীব্র আপত্তি জানিয়ে যা বলছেন শীর্ষ আলেমরা

এদিকে ভারতজুড়ে একাধিক বিশিষ্ট মুসলিম সংগঠন সরকারি অনুষ্ঠান, স্কুল ও কলেজে ‘বন্দে মাতরম’-এর সমস্ত শ্লোক পাঠ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। তারা বলছে, জাতীয় সঙ্গীতের আগে জাতীয় গানের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ পাঠ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মিল্লাত টাইমসের সৌজন্যে মুসলিম নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরা হল।

মাওলানা আরশাদ মাদানি

জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের সভাপতি আরশাদ মাদানি এ সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটি সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত ধর্মীয় স্বাধীনতাকে খর্ব করার একটি প্রচেষ্টা।’

আরও বলেন, ‌‘দেশকে ভালোবাসা আর তার উপাসনা করা দুটি ভিন্ন বিষয়। কেউ বন্দে মাতরম গাইলে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু মুসলমানরা এর এমন কোনো অংশ পাঠ করতে পারে না যা তাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী।’

মাদানির দাবি, গানটির কিছু শ্লোকে দেব-দেবীর উল্লেখ রয়েছে, যা ইসলামী একেশ্বরবাদী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলেন, এটি প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড

অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডও এই বিজ্ঞপ্তির বিরোধিতা করেছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফজলুর রহিম মুজাদ্দিদী বলেন, এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক ঐকমত্যকে উপেক্ষা করেছে, যেখানে বন্দে মাতরম-এর কেবল প্রথম দুটি স্তবক জাতীয় প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছিল।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জওহরলাল নেহেরুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেন গানটির পরবর্তী অংশ বাদ দিয়ে প্রথম কয়েকটি স্তবক গ্রহণ করা হয়। কারণ পরবর্তী শ্লোকগুলো একেশ্বরবাদী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। পরবর্তীতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও সেই অবস্থানকে সমর্থন করেছিল।

মুফতি মুহাম্মদ সাঈদ আল-রহমান কাসেমি

মুফতি মুহাম্মদ সাঈদ আল-রহমান কাসেমি বলেন, আদালত পূর্বে রায় দিয়েছে, কোনো নাগরিককে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো গান গাইতে বাধ্য করা যাবে না।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের আবৃত্তিতে বাধ্য করা সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐক্য উভয়কেই ক্ষুণ্ণ করে।’

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমীন

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমীন (এআইএমআইএম)-এর জাতীয় মুখপাত্র সৈয়দ আসিম ওয়াকার সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এই বিষয়ে মুসলমানদের নীরব থাকা উচিত। প্রকাশ্য সংঘাত কেবল অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করবে।”

এদিকে এআইএমআইএম-এর রাজ্য সভাপতি আখতারুল ইমান বলেন, “এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। আমাদের ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের নিজ ধর্ম অনুসরণ করতে এবং অন্যের ধর্মকে সম্মান করতে শেখায়। সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে এটাই বলা আছে।”

বেঙ্গালুরু ইমামের বক্তব্য

দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরুর জামিয়া মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতিব মোহাম্মদ মাকসুদ ইমরান রশাদী বলেন, মুসলমানরা জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান করে এবং এ ধরনের বিতর্ক যেন শান্তি বিঘ্নিত না করে।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়াতে বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করা উচিত।’

নির্বাচনের আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে এমন নির্দেশনা আসায় অনেক নেতা এর সময় নির্বাচনমুখী বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ ঐক্য গড়ে তোলার পরিবর্তে বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।

মুসলিম সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয় সরকারকে দ্রুত বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা না করলে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।

উল্লেখ্য, ‘বন্দে মাতরম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘মাতৃভূমিকে বন্দনা করি’ বা ‘মায়ের বন্দনা করি’। ‘বন্দে মাতরম’ একটি বিতর্কিত দেশাত্মবোধক গান, যা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২)-এ প্রথম প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ভারতের সরকার এটিকে ‘জাতীয় গান’ (National Song) হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হলো ‘জন গণ মন’। তবে মুসলিম নেতাদের মূল আপত্তি হলো, গানটির কিছু শ্লোকে দেব-দেবীর উল্লেখ ও উপাসনামূলক ভাষা রয়েছে, যা ইসলামী একেশ্বরবাদী আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক; ফলে তারা মনে করেন, এ গান বা এর পূর্ণাঙ্গ শ্লোক বাধ্যতামূলক করা হলে তা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222