চীনা বিনিয়োগে বড় সুখবর, ঘুরবে দেশের ভাগ্যের চাকা!

by hsnalmahmud@gmail.com

চিফ রিপোর্টার:: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বেইজিং সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের অর্থনীতিতে দারুণ এক সুখবর এসেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন উদীয়মান ও কৌশলগত খাতে প্রায় ৯.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ashik চৌধুরী জানিয়েছেন, এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাতে এক অভাবনীয় বিপ্লব আসবে।

বিনিয়োগের প্রস্তাবিত খাতগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দেশের লজিস্টিকস ও অবকাঠামো উন্নয়ন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.৫ বিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করা হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আধুনিকায়নে (পিপিপি মডেল), যা দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইনের চেহারা বদলে দিতে পারে। এ ছাড়া পায়রা শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং খাতে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৮৯০ মিলিয়ন ডলার এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এসেছে। অন্যান্য খাতের মধ্যে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে ২৭০ মিলিয়ন, গ্যাস খাতে ২৫০ মিলিয়ন, স্মার্ট মিটার উৎপাদনে ২৫০ মিলিয়ন এবং রেল কোচ উৎপাদনে ১৯০ মিলিয়ন ডলারসহ ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ ও ঔষধি উদ্ভিদ শিল্পে বিপুল বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

এক নজরে চীনের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক (PPP) প্রকল্পে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের প্রধান অর্থনৈতিক লাইফলাইনের আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

পায়রা শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং খাতে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এসেছে, যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নে বড় পদক্ষেপ।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (Waste-to-Energy) খাতে ৮৯০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করবে।

মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে ২৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।

গ্যাস খাত ও স্মার্ট মিটার উৎপাদন—এই দুটি খাতের প্রতিটিতে ২৫০ মিলিয়ন করে মোট ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে।

অন্যান্য খাত যেমন টেক্সটাইল, ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ, রেল কোচ উৎপাদন এবং ঔষধি উদ্ভিদ শিল্প—এই ক্ষেত্রগুলোর প্রতিটিতে ১৯০ মিলিয়ন করে মোট ৫Map৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি ও বেইজিংয়ে শীর্ষ বৈঠক
গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটিই প্রথম চীন সফর। অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি।

বর্তমানে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশ যেখানে চীন থেকে ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, সেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

‘বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমরা চীনে আমাদের রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়তা চাই।’— প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

গত শুক্রবার (২৭ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই ঘাটতি দূরীকরণে বেইজিংয়ের সরাসরি সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বিশেষ করে বাংলাদেশের তাজা আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জলজ পণ্য, কাঁচা চামড়া এবং ওষুধশিল্পের পণ্যের রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বড় অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর আধুনিকায়নে চীনের অংশগ্রহণ চান।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত যেসব অ্যাকসেসরিজ বর্তমানে চীন থেকে আমদানি করা হয়, সেগুলো যেন বাংলাদেশেই উৎপাদন করা যায় এবং পরবর্তীতে চীনে রপ্তানি করা যায়, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। এ ছাড়া চীনের বিভিন্ন উৎপাদন হাব বাংলাদেশে স্থানান্তরের বিষয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক করিডোর

প্রধানমন্ত্রীর আরেক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, তবে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি সই হয়নি। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি সই হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের উন্নয়ন এগিয়ে নিতে বেইজিং প্রস্তুত। এ ছাড়া বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার’ প্রকল্পে চীন তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

ভূরাজনীতি ও ঋণের সমীকরণ

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের কাছে বর্তমানেচীনের ঋণের পরিমাণ ৬২০ কোটি মার্কিন ডলার। এ ছাড়া বেইজিংভিত্তিক এআইআইবি দিয়েছে আরও ২৩৩ কোটি ডলার। অন্যদিকে ভারতের ঋণের পরিমাণ ১৬০ কোটি ডলার। আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের এই সফরকে অত্যন্ত transatlantic ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

বেইজিংভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক চিম লি অবশ্য মন্তব্য করেছেন, চীন এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। তারা মূলত এমন লজিস্টিক করিডোরে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী যা ভবিষ্যতে সম্প্রসারণযোগ্য।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের দেওয়া এই নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো যদি দ্রুত চুক্তির মাধ্যমে কার্যকর করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222