যত্রতত্র শিক্ষাবোর্ড ও কিতাবপত্র মুদ্রণ : কোটি টাকার ব্যবসার অন্তরালে

মাওলানা লাবীব আব্দুল্লাহ

by Masudul Kadir

​কওমি শিক্ষাবোর্ডের ছড়াছড়ি : ​আমাদের কওমি শিক্ষাবোর্ডগুলোর সঞ্চয়ে বর্তমানে কোটি কোটি টাকা জমা রয়েছে—কারো কারো ক্ষেত্রে তা শত কোটির কাছাকাছি। দেশে কওমি মাদরাসার মোট বোর্ড সংখ্যা ঠিক কত, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, তবে তা কোনোভাবেই পঞ্চাশের কম হবে না। কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক বোর্ড থেকে শুরু করে বিভাগীয়, জেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও শিক্ষাবোর্ড গড়ে উঠেছে।
​দীর্ঘ ২২ বছর আলেমদের একটি আঞ্চলিক সংগঠনের শিক্ষা সম্পাদক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে আমি উত্তরাঞ্চলীয়, সিলেট, কিশোরগঞ্জ এবং গাজীপুর কেন্দ্রিক বিভিন্ন বোর্ডের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছি। এমনকি ময়মনসিংহের একটি থানা ও গ্রামকে কেন্দ্র করেও শিক্ষাবোর্ড পরিচালিত হতে দেখেছি। পৃথিবীতে একটিমাত্র নির্দিষ্ট শিক্ষাধারায় এত বিপুল সংখ্যক বোর্ডের উপস্থিতি সত্যিই নজিরবিহীন।

​পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ : ​এই বোর্ডগুলোর আয়ের মূল উৎস হলো ‘তালেবে ইলম’ বা শিক্ষার্থীদের পকেটের টাকা। পরীক্ষা ফি, মাদরাসা নিবন্ধন ফি, বার্ষিক চাঁদা এবং কিছু বিচ্ছিন্ন অনুদানই এদের পুঁজি। ফলে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীকে একই বছর একাধিক বোর্ডে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। হিফজ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী একই সাথে বেফাক ও স্থানীয় আঞ্চলিক বোর্ডে পরীক্ষা দিচ্ছে—এমন নজিরও অহরহ।

বিজ্ঞাপন
banner

​বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা হয় পাঁচ বা ছয়টি স্তরে। এরপর ছয়টি বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া’র অধীনে আল-হাইআতুল উলয়া বা মাস্টার্স সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যদিও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো একক ‘বোর্ড’ মাস্টার্স পরীক্ষা নেয় না; সেখানে ফাযিল-কামিলের পরীক্ষা নেয় ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ মাস্টার্সের সনদ দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কওমি মাদরাসার বোর্ডগুলো পুরোপুরি পরীক্ষানির্ভর হয়ে পড়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে প্রতি বছরই কোনো না কোনো কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষা জীবনকে পরীক্ষাময় করে তুলেছে। এই যত্রতত্র গড়ে ওঠা বোর্ডগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, এগুলো একসময় কেবল ‘প্রশ্নপত্র বিক্রির কেন্দ্রে’ রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

​পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ: কোটি টাকার হাতছাড়া বাণিজ্য : ​মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। বেফাকের নিজস্ব মৌলিক বই রয়েছে প্রায় ত্রিশটি। এছাড়া ‘দরসে নেজামি’র প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি প্রধান কিতাব রয়েছে, যা কওমি মাদরাসাগুলোতে নিয়মিত পড়ানো হয়। এই কিতাবগুলো বোর্ডের নিজস্ব প্রকাশনা বা পাঠ্যবই প্রণয়ন ও মুদ্রণ বিভাগের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারতো। কিন্তু তা না হওয়ায়, শত কোটি টাকার এই বিশাল বাজার চলে গেছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রকাশনীর নিয়ন্ত্রণে।

​প্রতি বছর রমজান থেকে ঈদুল আজহা পর্যন্ত সময়ে দরসি কিতাবের কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলে। এই সময়ে প্রকাশকদের শোরুম বা দোকানে সাধারণ ইসলামী বই রাখার জায়গা পর্যন্ত থাকে না; দরসি কিতাবের চাপে সৃজনশীল বা সাধারণ ঘরানার ইসলামিক বইয়ের প্রতি প্রকাশকদের তীব্র অনাগ্রহ দেখা যায়। অথচ, উন্মুক্ত এই কিতাব বিক্রির প্রতিযোগিতায় বেফাক বা অন্য কোনো বোর্ডের কার্যকর কোনো অংশগ্রহণ নেই। (ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত লাগতে পারে বিধায় প্রকাশনীগুলোর নাম এখানে উল্লেখ করা হলো না)।

​বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তা ও তরুণ আলেমদের কর্মসংস্থানের সুযোগ : ​বেফাক বা কওমি বোর্ডগুলো কেন এই কিতাবপত্র মুদ্রণের উদ্যোগ নেয় না, তা আসলেই এক রহস্য। এটি কিছুটা জটিল ও ঝামেলার কাজ হলেও, এর সাথে কওমি মাদরাসাগুলোর বিশাল আর্থিক স্বার্থ জড়িত। ​বোর্ডগুলো যদি নিজেরা কিতাব প্রকাশের দায়িত্ব নিত তাহলে যা হত

​দক্ষ জনবল তৈরি : তরুণ আলেম সমাজ প্রকাশনা শিল্পের সাথে যুক্ত হতে পারতো। কম্পোজ, প্রচ্ছদ ডিজাইন, গেটাপ-মেকাপ ও মুদ্রণশিল্পের বিভিন্ন শাখায় তারা দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ পেতো।

​বিশাল কর্মসংস্থান : কোটি কোটি টাকার এই বাণিজ্যে কওমি মাদরাসার তরুণ আলেমদের একটি বড় অংশের স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হতো।

​আর্থিক স্বাবলম্বিতা : বোর্ডগুলো নিজেরা কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারতো। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ফি না নিয়ে, উল্টো মাদরাসাগুলোকে বার্ষিক আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হতো।

​প্রত্যাশা ও করণীয় : ​আশা করি, কওমি মাদরাসার নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাববেন এবং দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। আমাদের দাবি খুবই স্পষ্ট—শিক্ষার্থীদের জন্য কিতাব হতে হবে সম্পূর্ণ নির্ভুল, উন্নত কাগজে ঝকঝকে ছাপা এবং আকর্ষণীয় বাঁধাইয়ের। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই কিতাবগুলোর মূল্য হতে হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাগালের মধ্যে ও সুলভ।

লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222