হাসান আল মাহমুদ >>
সরকার সম্প্রতি ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫’ জারি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (সংগীত) ও সহকারী শিক্ষক (চারুকলা) পদ সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষক নিয়োগের দাবি থাকলেও নতুন বিধিমালায় তা অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন, শিক্ষাবিদ, আলেমসমাজ ও জনপ্রিয় ইসলামিক বক্তারা তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছেন।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘শিক্ষা একটি আদর্শিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন খাত। এখানে ইসলাম ও বাঙ্গালির আত্মপরিচয়ের বিপরীতমুখী উপকরণ সংযোজন সংবিধান, দেশের সংস্কৃতি ও সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নেতৃদ্বয় বলেন, ‘যে দেশে লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন কুরআন-হাদিস, নৈতিকতা ও নৈতিক সংস্কৃতির পাঠ নিয়ে বড় হচ্ছে, সেই দেশে নৈতিক শিক্ষা বাদ দিয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ একটি পরিকল্পিত ধর্মবিমুখ নীতির বহিঃপ্রকাশ। এটি কার স্বার্থে, কার উদ্দেশ্যে এবং কীসের ভিত্তিতে করা হচ্ছে,তা জাতি জানতে চায়।’
অবিলম্বে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিশুদের চরিত্র গঠনে ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান তারা।
জাতীয় মুফতী বোর্ড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাইখুল হাদিস মুফতি খোরশেদুল আলম কাসেমী ৩৬ নিউজকে বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা না রেখে গানের শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তে জাতির ভবিষ্যৎ ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।
তিনি বলেন, ‘গানের শিক্ষক নিয়োগ দিলে দেশের জন্য নানা ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে।’
তিনি উল্লেখ করেন—
- ছোট শিশুদের মনে গান-বাজনা প্রবেশ করালে তারা আল্লাহভীরু, নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার বদলে ভোগবাদী হয়ে বেড়ে উঠবে।
- ইসলামী সংস্কৃতি ও চরিত্র ধ্বংস হবে, নতুন প্রজন্ম ইসলাম ও বাঙালি পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
- অভিভাবকদের আস্থা সরকারি শিক্ষার প্রতি কমে যাবে, শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
- নৈতিক শিক্ষা বাদ দেওয়ার কারণে সমাজে কিশোর অপরাধ, গ্যাং কালচার ও মাদকাসক্তি বাড়বে।
- বিদেশি এনজিও ও পশ্চিমা প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢুকে পড়বে।
- চরিত্রহীন শিক্ষিত প্রজন্ম জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারবে না, ফলে রাষ্ট্র ধ্বংসের দিকে যাবে।
তিনি অবিলম্বে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করে প্রতিটি বিদ্যালয়ে আলেম-ওলামাদের ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে।’
দাওয়াতি ও মানবিক সংগঠন পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশের আমির ড. মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী ৩৬ নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রফেসর ড. ইউনুস কিসের ভিত্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। কারণ প্রাথমিক শিক্ষায় যেখানে নৈতিকতা শিক্ষা সবচেয়ে বেশি দরকার, সেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে তিনি সংগীত ও ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষক নিয়োগের নামে অপসংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে নতুন প্রজন্মের চরিত্রকে ধ্বংস করতে চাচ্ছেন।’
তিনি অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের প্রতি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘এতটুকু জ্ঞান-বুদ্ধি তার নেই, তাহলে তিনি কিসের ভিত্তিতে নোবেল পেয়েছেন নাকি এর মাধ্যমে পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে প্রতিটি প্রাইমারী স্কুলে আলেমদের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ ইমতিয়াজ আলম অভিযোগ করেন, সরকার অভিভাবক ও আলেমদের দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করছে। ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংগীতবিষয়ক শিক্ষক নিয়োগকে জনআকাঙ্ক্ষা পরিপন্থি। অথচ দীর্ঘ বছরের পর ধরে প্রাইমারি স্কুলগুলোতে একজন আরবী/ নূরাণি শিক্ষক নিয়োগের জন্য দেশের উলামায়ে কেরাম দাবি করে আসছেন। এ বিষয়টি চরম উদ্বেগজনক। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্ম শিক্ষক নিয়োগে এদেশের অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবিকে উপেক্ষা করে, অযাচিতভাবে সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা প্রদান করেছে। আমরা এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। যেদিন থেকে সারওয়ার ফারুকী উপদেষ্টা নিয়োগ হয়েছে সেদিন থেকেই বর্তমান সরকারের মূল্যবোধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ে জোরালো বক্তব্য ও মতামত তুলে ধরেন জনপ্রিয় ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ ও ড. মিজানুর রহমান আজহারী।
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘কত শতাংশ মানুষ তাদের সন্তানকে গান শেখায়? অভিভাবকরা সাধারণত মক্তবে পাঠান বা প্রাইভেট ধর্মীয় শিক্ষক রাখেন। সরকার যদি ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিত, অভিভাবকরা খরচ ও ঝামেলা থেকে মুক্ত হতো।’
ড. মিজানুর রহমান আজহারী বলেছেন, ‘সংগীত শিক্ষক নিয়োগ জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। আমরা আমাদের সন্তানদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের নিরাপত্তা চাই।’
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইন্টেরিম সরকারের সমালোচনা চলছে জোরালোভাবে। তারা বলছেন, ড. ইউনূস ভালো কা করলেও কয়েকটি বিষয়ের কারণে তিনি প্রচন্ড সমালোচিত হতে যাচ্ছেন। এ ধরনের সমালোচনাযোগ্য বিষয় অবিলম্বে পরিহার করে গণমানুষের আকাঙ্খা অনুযায়ি কাজ করতে তারা আহ্বান জানান।
এদিকে ইসলামী আলোচক লেখক গবেষক যুবায়ের আহমাদ ৩৬ নিউজকে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক না নিয়োগের কারণে শিশুদের ইসলামের আলো ও নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিনি ৬৫ হাজার সরকারি স্কুলে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব দেন এবং উল্লেখ করেন, এতে শিশুদের ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ৬৫ হাজার আলেমের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।
বিশিষ্ট আলেম ও মুহাদ্দিস মুফতি শামসুল আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক নেই! অথচ গানের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এসময় তিনি ‘কওমি মাদরাসা থেকে দাওরা ফারেগদের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জোর দাবি জানান।
শিক্ষাবিদ আলেম আশরাফ আলম কাসেমী নদভী বলেন, ‘সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ৬৫,৫০০ সংগীত শিক্ষক নিয়োগ করতে পারলেও ধর্ম উপদেষ্টা অন্তত ৬৫ জন ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে ব্যর্থ হলে পদত্যাগ করা উচিত।’
আলেমসমাজ ও ইসলামিক স্কলাররা একযোগে দাবি করেছেন, অবিলম্বে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষায়িত ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তা না হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ সংকটে পড়বে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
হাআমা/
