ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কোটদ্বার শহরের ৪২ বছর বয়সী এক জিম মালিক দীপক কুমার। গত ২৬ জানুয়ারি একটি সাধারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তিনি এখন ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষতার আইকন’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। এক মুসলিম বৃদ্ধ দোকানদারকে উগ্রপন্থি হিন্দু সংগঠনের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন, তা দেশটির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই অনুপ্রেরণামূলক খবরটি প্রকাশ করেছে।
ঘটনাটি ঘটে কোটদ্বারের ‘বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার’ নামক একটি কাপড়ের দোকানে, যার মালিক ৬৮ বছর বয়সী ভকিল আহমেদ। কট্টরপন্থি সংগঠন বজরং দলের কর্মীরা হঠাৎ ওই দোকানে চড়াও হয়ে দাবি করে, ‘বাবা’ শব্দটি কেবল হিন্দু দেবতা হনুমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং একজন মুসলিম এটি ব্যবহার করতে পারবেন না। ভকিল আহমেদের ছেলে সময় প্রার্থনা করলেও উগ্রপন্থিরা ক্রমাগত চড়াও হচ্ছিল। পাশেই বন্ধুর দোকানে থাকা দীপক কুমার এই দৃশ্য দেখে স্থির থাকতে পারেননি। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি সাহসের সঙ্গে ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন, ‘মুসলিমরা কি ভারতের নাগরিক নয়?’ বজরং দলের কর্মীরা যখন তার নাম জানতে চায়, তিনি তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নিজের নাম বলেন— ‘মোহাম্মদ দীপক’।
পরবর্তীতে বিবিসি হিন্দিকে দীপক বলেন, হিন্দু ও মুসলিম নামের এই সংমিশ্রণ তিনি সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন যাতে কট্টরপন্থিরা বুঝতে পারে যে তিনি সবার আগে একজন ভারতীয়। তার এই অকুতোভয় উত্তরে সেদিন আন্দোলনকারীরা পিছু হটলেও বর্তমানে দীপককে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তার জিমের সামনে দেড় শতাধিক উগ্রপন্থি বিক্ষোভ করেছে, তাকে ‘ধর্মের গদ্দার’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি এই ঘটনার পর তার জিমের সদস্য সংখ্যা ১৫০ থেকে কমে মাত্র ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। পরিবার আতঙ্কিত থাকলেও দীপক তার অবস্থানে অনড়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, “আমি হিন্দু বা মুসলিম নই, সবার আগে আমি একজন মানুষ।”
দীপক কুমারের এই বীরত্বকে স্বাগত জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ ভারতের বহু সমাজকর্মী। রাহুল গান্ধী তাকে ‘ভারতের নায়ক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, দীপক ‘ঘৃণার বাজারে ভালোবাসার দোকান’ খুলেছেন। অন্যদিকে, ভকিল আহমেদ কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেছেন যে, সেদিন দীপক না থাকলে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেত। আর্থিক ও সামাজিক চাপের মুখে থাকলেও দীপক কুমার বলছেন, “আজ যদি আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকি, তবে আমাদের সন্তানরাও আগামীকাল এই নীরবতাই শিখবে।” তার পাশে দাঁড়াতে ইতোমধ্যে বহু সাধারণ মানুষ তার জিমের সদস্যপদ কিনে সংহতি প্রকাশ করছেন।
টিএইচএ/
