সম্প্রতি একটি পডকাস্টে মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাহেব কর্তৃক শাপলা গণহত্যা বিষয়ে অস্বীকারমূলক বক্তব্য প্রদান করায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে শাপলা স্মৃতি সংসদ।
সোমবার (২৫ মে) এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত ঘটনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর অধ্যায়। নিরস্ত্র আলেম-ওলামা, তৌহিদী জনতা ও সাধারণ মানুষের ওপর পরিচালিত অভিযানে বহু হতাহতের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বহু পরিবার আজও স্বজন হারানোর বেদনা বহন করছে এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে।
তিনি বলেন, এমন একটি রক্তাক্ত ঘটনাকে অস্বীকার করা বা এর গুরুত্ব খাটো করে দেখানো শুধু শহীদদের স্মৃতির প্রতিই অবমাননা নয়; বরং আহত ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের বেদনাকেও অস্বীকার করার শামিল। যে ঘটনার বিচার ও সত্য উদ্ঘাটনের দাবি এখনও অব্যাহত, তাকে অস্বীকার করার যেকোনো প্রচেষ্টা ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ম্যাস কিলিং (Mass Killing) বা গণহত্যা আন্তর্জাতিক গবেষণা ও মানবাধিকার আলোচনায় সুপ্রতিষ্ঠিত একটি ধারণা। শাপলা ট্র্যাজেডিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্য এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও একে অস্বীকার করার প্রচেষ্টা বিষয়টির মৌলিক সংজ্ঞা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে গুরুতর অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলা হয় ঘটনার এত দীর্ঘ আলোচনা, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকার পরও কীভাবে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে অস্বীকারমূলক মন্তব্য করতে পারেন?
শাপলা স্মৃতি সংসদ উল্লেখ করে যে, প্রশাসনিক তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী ৫–৬ মে সময়ে শুধুমাত্র ঢাকায় ৩২ জনের শাহাদাতের তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনের নিজস্ব অনুসন্ধান ও তথ্যসংগ্রহের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ৬৭ জন শহীদের বিস্তারিত পরিচয় সংরক্ষণ করে ‘শহীদনামা’ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে মাদানীনগর, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’সহ বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হতাহতের ঘটনা, নিখোঁজ হওয়া ও লাশ গুমের অভিযোগ নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তৎকালীন সময়ে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার কারণে গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর চাপ ও হয়রানির অভিযোগও দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, শাপলা গণহত্যাকে অস্বীকার করা মানে কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়; বরং শহীদ পরিবারগুলোর সাক্ষ্য, মানবাধিকার সংস্থার অনুসন্ধান এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারিক কার্যক্রমকেও পরোক্ষভাবে অগ্রাহ্য করা। এ ধরনের বক্তব্য সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচারের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে এবং বিচারপ্রত্যাশী পরিবারগুলোর ক্ষতকে নতুন করে রক্তাক্ত করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও শ্রদ্ধেয় আলেমের মুখ থেকে এমন বক্তব্য জাতিকে বিস্মিত ও মর্মাহত করেছে। ব্যক্তি হিসেবে তাঁর প্রতি সম্মান অটুট থাকলেও ইতিহাস, শহীদদের রক্ত ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। শাপলা গণহত্যার সত্যকে আড়াল, অস্বীকার কিংবা বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা ইতিহাসের আদালতে ব্যর্থ হতে বাধ্য।
শাপলা স্মৃতি সংসদ শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ, আহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং শাপলা গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় এবং সকল বিবেকবান নাগরিক, গবেষক, আলেম-উলামা, মানবাধিকারকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানায়।
হাআমা/
