মাদক আধুনিক সভ্যতার এক বিষাক্ত ব্যাধি। এটি ব্যক্তির মস্তিষ্ক, লিভার, হৃদ্যন্ত্র ও মানসিক সুস্থতাই ধ্বংস করে না, সঙ্গে মানুষের নৈতিকতা ও বিবেক-বুদ্ধি লোপ করে সমাজে নানা অপরাধের জন্ম দেয়। ইসলামে মাদককে বলা হয়েছে ‘উম্মুল খাবায়েস’ বা সর্বপ্রকার জঘন্যতার মূল।
শরিয়ত প্রণয়নের যে পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য রয়েছে (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) দ্বীন, জীবন, বংশ, সম্পদ ও বুদ্ধি সংরক্ষণ তার মধ্যে ‘বুদ্ধি বা জ্ঞান রক্ষা’র স্বার্থেই ইসলামে মাদককে কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে। আরব সমাজ জাহিলি যুগে মদ্যপানে প্রচণ্ড আসক্ত ছিল। তাদের এই মজ্জাগত অভ্যাস দূর করতে ইসলাম এক অপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ধারাবাহিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল, যা মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
প্রথম ধাপে সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে মদের ক্ষতিকর দিকগুলো সামনে এনে সচেতনতা তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে সুরা নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে নামাজের সময় মদ্যপান আংশিক নিষিদ্ধ করা হয়, যাতে মানুষ অন্তত ইবাদতের সময় সচেতন থাকে। সর্বশেষ তৃতীয় ধাপে সুরা মায়েদার ৯০-৯১ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে মানুষের অন্তর যখন পুরোপুরি প্রস্তুত হলো, তখন মদকে চিরতরে হারাম করে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইসলামে শুধু মাদক সেবনই নয়, এর পুরো উৎপাদন ও বিপণন চক্রটিকে নিষিদ্ধ ও সমাজবিধ্বংসী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সুনানে নাসায়ির এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যই মদ, আর যাবতীয় মদই হারাম। মদের ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম। জামে তিরমিজির বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০ শ্রেণির ব্যক্তির ওপর অভিশাপ বা লানত দিয়েছেন। তারা হলেন নির্যাস প্রস্তুতকারী, যার জন্য প্রস্তুত করা হয়, সেবনকারী, বহনকারী, যার কাছে বহন করা হয়, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, লভ্যাংশভোগী, ক্রেতা এবং যার জন্য ক্রয় করা হয়। মাদকের এই সর্বগ্রাসী ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ইসলাম বহুমুখী প্রতিরোধব্যবস্থার নির্দেশনা দেয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো আত্মিক ও ধর্মীয় অনুশাসন। মানুষকে আল্লাহমুখী করা এবং পরকালের জবাবদিহির অনুভূতি জাগ্রত করার মাধ্যমে অন্তর থেকে মাদকের আকর্ষণ দূর করা সম্ভব।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ার ওপর ইসলাম বিশেষভাবে জোর দেয়। সন্তানেরা যেন কোনো দুষ্ট বন্ধু বা অসৎ সঙ্গের পাল্লায় না পড়ে, সেদিকে পরিবারের কড়া নজর রাখতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা রুখে দিতে হবে। এর পাশাপাশি যারা সমাজে মাদক চোরাচালান, বাজারজাত বা প্রচার-প্রসার করে, তাদের জিরো টলারেন্স নীতিতে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যুবসমাজের বেকারত্ব দূরীকরণে বিভিন্ন গঠনমূলক কোর্স ও সমাজসেবামূলক কাজে তাদের নিয়োজিত রাখার পাশাপাশি আলেম, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের নিয়মিত সচেতনতামূলক কাজ করতে হবে। অন্য সব অপরাধ থেকে মানুষ চাইলেই সহজে তওবা করে ফিরে আসতে পারে, কিন্তু মাদক মানুষের বিবেক-বুদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। তাই একটি সুস্থ, সচেতন সমাজ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে মাদকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
টিএইচএ/
