কবিতা একটি আলোক, যাতে প্রবেশ করার পর কিছুক্ষণ আগের দুনিয়া আর তখনকার দুনিয়া এক মনে হবে না

by Nur Alam Khan

কবিতা বা পদ্য ছাড়া পৃথিবীতে কোনো জাতি বা সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই, কখনো ছিল না। ধারণা করা হয়, যখন পৃথিবীর মানুষের কোনো অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তখনো মানুষের মুখে কবিতা ছিল। কবিতা নানা সময়ে নানা রূপে এসেছে। কবিতার ভিন্ন ভিন্ন রূপগুলোই আজ কবিতার বিভিন্ন শাখায় পরিণত হয়েছে। মানব মনের বিচিত্র অনুভুতির ছন্দময় প্রকাশকে কবিতা বলা যায়। শব্দের নিপুণ বিন্যাস, ভাষার সৌকর্য, ও আভরণে কবিতা বিচিত্র বৈভবে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে। একটি কবিতা যথার্থ কবিতা হওয়ার জন্য আরো কয়েকটি উপাদান বা অনুষঙ্গ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ।

এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো, শব্দালঙ্কার, রূপক-উপমা-প্রতীক-রূপকল্প ইত্যাদি। এ সবের সমন্বিত, সুসঙ্গত ও কুশলী ব্যবহারে কবিতা যথার্থ কবিতা হয়ে ওঠে। এ ধরনের কবিতা অনেক সময় এতটাই শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে যে, তখন এগুলোকে অনায়াসে কবিতার শিল্প বলা যায়। কবিতার নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নেই। যেকোনো বিষয়ই কবিতার উপজীব্য হতে পারে। ব্যক্তিগত, সামাজিক, ধর্মীয়, জাতিগত, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, প্রেম-বিরহ, আনন্দ-ভালোবাসা, নৈসর্গিক বিষয় ইত্যাদি সবকিছুই কবিতার বিষয়বস্তু হতে পারে। উপরিল্লিখিত কবি এবং কবিতার নানন বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা করেছেন সময়ের আলোচিত শক্তিমান কবি ওমর আল হুসাইন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি মোশাররফ হোসাইন।

বিজ্ঞাপন
banner

মোশাররফ হোসাইন: আসসালামু আলইকু। ওমর ভাই কেমন আছেন?

ওমর আল হুসাইন: ওয়ালাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

মোশাররফ হোসাইন : বর্তমানে দেশ ছেড়ে মিশরে কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন?

ওমর আল হুসাইন : টুকটাক পড়ছি, লিখছি। পিরামিডের দেশে পিরামিড না দেখে জীবন-জীবিকা দেখছি!

মোশাররফ হোসাইন : প্রথমে কবিতা এবং ছড়া নিয়ে প্রশ্ন করি। এই দু’টোয় আপনি শক্তিমান। আগামীতে কি গল্প বা উপন্যাস আসবে?

ওমর আল হুসাইন : বিব্রতকর ও আত্মঅহমিকার প্রশ্ন এটা। আমি শক্তিমান কি-না, তা অন্যদের থেকে জানতে পারলে ভালো হবে। এবং তরুণ কবিদের থেকে জানতে পারলে আরো বেশি ভালো হবে। সিনিয়র অনেকের থেকেই অনেক প্রশ্রয় পেয়েছি। কিন্তু তরুণরা আমাকে আগে কবি হিসেবে আশ্রয় দিতে হবে! উপন্যাস বা গল্প আসবে, ইন শা আল্লাহ।

মোশাররফ হোসাইন : আচ্ছা আপনি তো কবিতা লেখেন, তো আপনার পরিবার থেকে কি কখনো এই বিষয়ে লেখালেখির অনুপ্রেরণা পেয়েছেন?

ওমর আল হুসাইন : আমার বড় আপু। তিনিও কবিতা লিখতেন। বারো বছর সংসারে আছেন। আশ্চর্য ব্যপার হইলো, তিনি এখন ঠিকঠাক (শুদ্ধ উচ্চারণে) বাঙলা পড়তেও পারেন না।

মোশাররফ হোসাইন : আপনার প্রথম কবিতার বই এমন অতৃপ্ত দুপুর নিয়ে কিছু বলুন?

ওমর আল হুসাইন : এটা নিয়ে তেমন বলার নেই। তবুও বলি, যদিও এই বইটাই আমার না বলা কথা। অনেক পাঠক ও লেখক এটা নিয়ে টুকটাক বলেছেন। আবার আমার অনেক ঘনিষ্ঠজন লেখকরাও বলেননি। কারণ, নানান বিষয়ে আমি রুঢ় মানুষ। শক্ত বিষয়ে শক্ত কথা বলি। তা তারা পছন্দ করেন না বোধহয়! আমি যেটা বলবো, তা হলো— এমন অতৃপ্ত দুপুর’ মূলত একটা শূণতার বয়ান। শূণ্যতা কতভাবে আমাদের জড়িয়ে ধরে, তা এ-ই।

মোশাররফ হোসাইন :বাংলা সাহিত্যে আপনার পছন্দের উপন্যাস কোনটা?

ওমর আল হুসাইন : একটা বলা মুশকিল, তবুও বলি, যেটার স্বাদ এখনো ঠোঁটে লেগে আছে— চাঁদের পাহাড়।

মোশাররফ হোসাইন : আপনার তো দুইটা বই প্রকাশ হলো, তো একজন তরুণ লেখক হিসেবে প্রকাশকদের ব্যাপারে আপনার ধারণা কেমন?

ওমর আল হুসাইন : ধারণা ভালো। পেশাদার প্রকাশকদের কথা যদি বলি। তবে মনে হয় প্রকাশকরা অনেককিছু ভুলে যান, ইচ্ছায়, বা অনিচ্ছায়

মোশাররফ হোসাইন : আপনার কবিতার বই এমন অতৃপ্ত দুপুর’ কে সমালোচকের দৃষ্টিতে কীভাবে দেখবেন?

ওমর আল হুসাইন : সিনিয়র এক কবি বলেছেন এ বইয়ে আমার ধারাবর্ষণ ঠিক ছিলো না। খোদা, ধর্ম, প্রেম ও যৌনতাকে এক কাতারে নিয়ে এসেছি। তারপর থেকে আমি ভাবতেছি, সত্যিই কি আমি এমনটা করতে পেরেছি?

মোশাররফ হোসাইন : বাংলা সাহিত্যে আপনার প্রিয় কবি কে?

ওমর আল হুসাইন : প্রিয় কবি তো একজন নয়, বহুজাতিক বহু কবি আছেন। সবচেয়ে প্রিয় কে বললে উত্তর দিতাম।

মোশাররফ হোসাইন : কার কবিতা সবচেয়ে বেশি পড়েছেন?

ওমর আল হুসাইন : রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র

মোশাররফ হোসাইন : আপনি বলেরেছন রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ’র কবিতা সবচেয়ে বেশি পড়েছেন, তার কবিতা নিয়ে আপনার মতামত কী?

ওমর আল হুসাইন : রুদ্র ধুমকেতু, আধুনিক বাংলা কবিতায়। রুদ্র কবিতার চেয়েও অধিক কিছু করে গেছেন। রুদ্র আরো বহুবছর পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক রবেন বাংলা সাহিত্যে।

মোশাররফ হোসাইন : বাংলা সাহিত্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কবিতার বই কোনটি?

ওমর আল হুসাইন : নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ এই তালিকা দীর্ঘ। তবুও যদি বলতে হয়, তবে এ মুহুর্তে যে নামটা মাথায় আসছে, তা বলি— সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উত্তর ফাল্গুনী’ ।

মোশাররফ হোসাইন : একজন তরুণ কবি হিসেবে কবিতা আসলে কেমন হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন?

ওমর আল হুসাইন : কবিতা আমি মনে করি ভিন্ন কিছু। মানে যা সকল কিছু থেকেই ভিন্ন। কবিতা একটি আলোক, যাতে প্রবেশ করার পর কিছুক্ষণ আগের দুনিয়া আর তখনকার দুনিয়া এক মনে হবে না। কবিতা পড়ার পর মনে হতে হবে, কোথাও কী যেন ঘটেছে বা ঘটবে!

মোশাররফ হোসাইন : একজন কবি কীভাবে গণমুখি হয়ে ওঠবেন? গণমুখি হয়ে ওঠার জন্য একজন কবির মধ্যে কি কি  থাকা জরুরি?

ওমর আল হুসাইন : এই প্রশ্নের উত্তর করা কঠিন। কারণ আমি গণমুখী নই, জনমুখীও নই। আমি বলা চলে গুহার মানব, যাকে খুব সহজে এড়িয়ে চলা যায়, নিকটজনেরাও এটা করে থাকে বড় চমৎকারভাবে!

মোশাররফ হোসাইন : আপনি তো কবি আবার আলেমও, তো আলেম হয়েও যে কবিতা লেখেন সেজন্য কি কখনো অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে?

ওমর আল হুসাইন : হয়েছে, অসংখ্যবার। আমার বহু আলেম সহপাঠীও আমাকে ফেসবুকে অকথ্য গালিগালাজ করেছে। এবং সফটভাবে বকাঝকা বয়কটও করেছে কিছু সুবিধাবাদী নিকটজন!

মোশাররফ হোসাইন : আপনার বেশির ভাগ কবিতায় হচ্ছে প্রেম বা প্রেমিকাকেন্দ্রিক এই বিষয়ে আপনার মতামত কি?

ওমর আল হুসাইন : এইটা বোধহয় অবিচারের প্রশ্ন আমার প্রতি। কৈশোরে প্রেমের কবিতা বেশি লেখেছি বটে। তবে ভাঙচুর, যুদ্ধ রাজনীতি ও দর্শন আমার বেশি প্রিয়। নতুন বইটা তো পড়েছেন— নত হয়ে যাওয়া হাওয়ার গতর?

মোশাররফ হোসাইন : একজন কবি হিসেবে আপনার পছন্দের ঋতু কোনটা?

ওমর আল হুসাইন : বসন্ত। গ্রামে থাকাকালীন বর্ষা, কারণ তুফান আমার কাছে উপভোগ্য। কায়রোতে শীত।

মোশাররফ হোসাইন : আপনার কবিতা লেখার জার্নি সম্পর্কে কিছু বলুন?

ওমর আল হুসাইন : জার্নি খুব সুখকর নয়। আবার অন্যদের মত অত কষ্টেরও নয়। তবে কবিতা করতে এসে কবি-অকবি বহুজন চিনেছি ও বহুজনের সাথে নানান কিছু শিখেছি। কখনো হাসছি, কখনো পুলকিত হয়েছি আবার কখনো সমালোচনা করেছি।

মোশাররফ হোসাইন : আপনার লেখালেখির হাতেখড়ি হয়েছিলো কখন?

ওমর আল হুসাইন : ১৩/১৪ সালের দিকে। মাদরাসার ফেস্টুন, দেয়ালিকা  ও রোজনামচা থেকে।

মোশাররফ হোসাইন : আমরা জানি, আপনি অরুণ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তা বন্ধ হওয়ার কারণ কী?

ওমর আল হুসাইন : অনেকগুলো কারণ আছে। কখনো বলিনি, আজ বলি। পত্রিকাটি নিয়ে কলরব কেন্দ্রিক একটি ঝামেলায় পড়ি। কাগজটির অর্থায়ন আমরা তিনজন যোগাতাম। আমাদে উপদেষ্টা যিনি তিনি ছিলেন কলরবের সাবেক নির্বাহী পরিচালক। তার সাথে কলরবের দ্বন্দ্ব আর আমি তখনো কলরবের সদস্য। এই দ্বন্দ্বে আমি পড়ে মোটামুটি অর্থ যোগান বন্ধ হয়ে যায় এবং পেছনের অর্ধ লক্ষ ঋণ কাটিয়ে ওঠতে আমাদের বছর পেরোয়। তবে আমরা ফিরবো, আগামী জানুয়ারি নাগাদ, ইন শা আল্লাহ। এবং আশা করি উপদেষ্টা যিনি, উনাকে নিয়েই ফিরবো।

মোশাররফ হোসাইন : বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে কার কবিতা আপনাকে মুগ্ধ করেছে?

ওমর আল হুসাইন : মুগ্ধ তো কতজনই করেছে। তবে অবাক হয়েছি রবীবাবু পড়ে। কত দশক আগে সে বলাকা লিখে গেছে, তবে এখনো মনে হয় সমান প্রাসঙ্গিক।

মোশাররফ হোসাইন : আপনিও তরুণ, তরুণদের কবিতা নিয়ে কিছু বলতে চান?

ওমর আল হুসাইন : তরুণদের নিয়ে বলবো না। বলতে হলে প্রতিষ্ঠিতদের নিয়ে বলতে চাই। অনেক প্রতিষ্ঠিত কবিই আছেন কবিতা বোঝেন না। এমনকি কবিতার লাইন বিন্যাসও জানেন না। তরুণরা কবিতা শিখে তাদের শুধরে দিক। এই বলাটাই আমি জোর গলায় বলতে চাই।

মোশাররফ হোসাইন : আপনার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কি?

ওমর আল হুসাইন : আমি সীমিত পাঠকের কাছে পৌঁছেছি। সে হিসেবে পাঠক আমাকে পড়ুক, আলোচনা-সমালোচনা করুক ছাড়া বাড়তি আর কীই-বা বলব।

মোশাররফ হোসাইন: ওমর ভাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

ওমর আল হুসাইন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

এনএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222