প্রতি বছর শাবান মাসের প্রথম সপ্তাহে কওমি মাদরাসাগুলোর কেন্দ্রীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একদিকে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশসহ (বেফাক) আঞ্চলিক বোর্ডগুলো পঞ্চম শ্রেণি (ইবতিদাইয়্যাহ) থেকে ফযীলত জামাত পর্যন্ত পরীক্ষা নেয়; অন্যদিকে সর্বোচ্চ স্তর তাকমীল বা দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে গ্রহণ করে সর্বোচ্চ বোর্ড ‘আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’।
বর্তমানে এই তাকমীল জামাতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ইসলামী স্টাডিজ’-এ মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর সমমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাক্রমের গভীরতা ও সময়সীমা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—মাত্র সাত বছরে তড়িঘড়ি করে যারা দাওরা সম্পন্ন করছেন বা যাদের করানো হচ্ছে, তারা কোন যুক্তিতে মাস্টার্সের দাবিদার হন, তা অনুধাবন করা দুষ্কর। বিপরীতে প্রচলিত সাধারণ ধারায় দীর্ঘ ১৬ বছর পড়েও অনেকে মূল কিতাবের নস বা ‘ইবারত’ সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারেন না—এমন পাল্টাযুক্তিও অবশ্য রয়েছে।
তবে বছরের ব্যবধান বা তাত্ত্বিক বিতর্ক যাই হোক না কেন, কওমি নিসাবের (পাঠ্যক্রম) মূল লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া হতে পারে না। প্রথাগত ‘দরসে নেজামী’র অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর কিতাবগুলো যদি যথাযথভাবে অধ্যায়ন করা হয়, তবে শিক্ষার্থীর ভেতর বিভিন্ন ইলমের একটি মৌলিক ও শক্তিশালী ‘ইস্তিদাদ’ বা যোগ্যতা তৈরি হয়। আর এই যোগ্যতাকে পুঁজি করেই ইলমের অতলান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব।
এখানে ‘তাকমীল’ (পূর্ণতা) কিংবা ‘ফারেগ’ এর মতো শব্দগত ধারণাতেও এক ধরণের মানসিক বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইলমের কখনো ‘তাকমীল’ হয় না, আর জ্ঞানচর্চা থেকে কোনোদিন ‘ফারেগ’ বা মুক্ত হওয়া যায় না। স্রেফ বাজারের নোট বা গাইড বইয়ের ওপর ভর করে পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়াকে প্রকৃত অর্থে সফলতা বলা যায় না; বরং সফলতার মাপকাঠি হওয়া উচিত ইলমের মহাসাগরে স্বাধীনভাবে সাঁতার কাটার সক্ষমতা অর্জন করা। আমরা যদি প্রকৃত দরসে নিজামীর মূল চেতনায় ফিরে যাই, তবে কোনো কৃত্রিম মাধ্যমের উপযোগিতা থাকে না। একজন সত্যিকারের তালেবে ইলমের আদর্শ তো হওয়া উচিত—”মরেঙ্গে হাম কিতাবোঁ পর, ওরাক হোগা কাফন আপনা” (কিতাবের বুকেই যেন আমার মরণ হয়, আর কিতাবের পাতাই যেন হয় আমার কাফন)।
আমাদের বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত প্রায় একই রকম—নির্দিষ্ট তিনটি প্রশ্নের উত্তর খাতায় কলমবন্দ করা। অতীতে প্রশ্ন হতো উর্দুতে, এখন হয় আরবিতে। কিন্তু প্রশ্ন আরবিতে হলেও তার উত্তর দেওয়া কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক (ইজবারি)? খসড়া প্রস্তাবের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সব কথা বিশদভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার্থে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
প্রস্তাবনাসমূহ:
১. বহুমাত্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি: কওমি মাদরাসার কেন্দ্রীয় ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলোতে প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে এসে বহুমাত্রিক ও আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন করা হোক।
২. মৌখিক ও প্রায়োগিক পরীক্ষা: বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নাহু ও সরফের (আরবি ব্যাকরণ) মতো মৌলিক বিষয়ে কেবল লিখিত পরীক্ষা না নিয়ে, বাধ্যতামূলক মৌখিক ও প্রায়োগিক (Practical) পরীক্ষা নেওয়া হোক।
৩. গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ (মাকালা): তাকমীল বা দাওরায়ে হাদিস স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য যেকোনো একটি হাদিস বা ইলমে হাদিসের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ বা ‘মাকালা’ লিখন বাধ্যতামূলক করা হোক।
৪. সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি: মুখস্থনির্ভরতা ও গাইড-নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে প্রশ্নপত্র প্রণয়নে আধুনিক ও সৃজনশীল পদ্ধতি (Creative Questioning) প্রবর্তন করা যেতে পারে।
৫. প্রান্তিক যোগ্যতা সনদ ও ভর্তি নীতিমালা: নাহু ও সরফের প্রান্তিক যোগ্যতা যাচাইয়ের বিশেষ সনদ গ্রহণ করা ব্যতীত কোনো শিক্ষার্থীকে মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্ন-মাধ্যমিক) বা ছানাবিয়াহ (উচ্চ-মাধ্যমিক) স্তরে বাংলাদেশের কোনো মাদরাসায় ভর্তির সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সম্মিলিত হাইয়াতুল উলয়া বা বোর্ডগুলোর সমন্বিত চিন্তাভাবনা ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
৬. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আধুনিক গ্রেডিং পদ্ধতি: ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রচলিত সনাতন পদ্ধতি (যেমন: মুমতাজ, জাইয়িদ জিদ্দান, জাইয়িদ, মকবুল, রাসেব) সংস্কার করা প্রয়োজন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জিপিএ (GPA) বা লেটার গ্রেডিং পদ্ধতি (A+, A, B ইত্যাদি) প্রবর্তন করলে কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক মূল্যায়নের পথ সহজ হবে।
৭. রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাস্তবায়ন ও কর্মসংস্থান: অর্জিত যোগ্যতার ভিত্তিতে তাকমীল সনদের যে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তার সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হোক। এই সনদ বাহকদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করে বিসিএসসহ সরকারি ও বেসরকারি সকল স্তরে রাষ্ট্রীয় সেবা ও কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হোক।
৮. নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ইন-সার্ভিস কোর্স: শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি ও আধুনিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হোক, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের ‘ইস্তিদাদ’ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
৯. কিতাবভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment): কেবল বছরের শেষে একটি চূড়ান্ত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে, বছরজুড়ে শ্রেণিকক্ষে কিতাবের ইবারত পঠন, তর্জমা ও ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর চূড়ান্ত ফলাফলের সাথে যুক্ত করা হোক।
১০. ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নিরাপদ ডাটাবেজ: পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ বা অনিরাপদ থার্ড-পার্টি ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, হাইয়াতুল উলয়া ও বেফাকের নিজস্ব সার্ভারে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বিজ্ঞাপনমুক্ত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হোক; যেন শিক্ষার্থীরা কোনো অনৈতিক বিজ্ঞাপনের ফাঁদে না পড়ে।
লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট
