কবিতায় ঈমানের দীপ্তি: ইসলামের প্রাঙ্গণে সাহিত্যের ভূমিকা

by Fatih Work

নাজমুল হুদা মজনু >>>

কবি ও কবিতা নিয়ে মানুষের আগ্রহ ইচ্ছা আবেগ অনুভূতি নতুন কোনো বিষয় নয়। ইসলামের সূচনা লগ্নেও কবি ও কবিতার ব্যাপক প্রভাব ছিল। বলা যায়, কাব্য-সাহিত্য চর্চার স্বর্ণযুগ ছিল সে সময়। এমনকি আল্লাহর হাবিব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাব্যচর্চায় তাঁর প্রিয় সাহাবায়ে কেরামকে উৎসাহিত করেছেন। আরবের মুশরিক কবিরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লামের পূতপবিত্র চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটাতে কবিতাকে ব্যবহার করেছে তখন তিনি সোনার মানুষ সাহাবায়ে কেরামকে ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে মোক্ষম জবাব দেয়ার জন্য কবিতার অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সাথে সত্য-মিথ্যার দুই ধারাকে নিয়েই কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
banner

কুরআন মাজিদে কবি ও কবিতা নিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন- ‘কবিদেরকে অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই।

তুমি কি লক্ষ করো না যে, তারা প্রত্যেক উপত্যকায় (অঙ্গনে) উদভ্রান্ত হয়ে (বিভ্রান্তিমূলক কথা নিয়ে) ঘুরে বেড়ায়। এবং তারা যা বলে তা তারা করে না।

কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে এবং অত্যাচারিত হ‌ওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে; (বিপক্ষের সমালোচনার উত্তর কবিতার মাধ্যমে প্রদানের মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণ করে; যেমন কবি হাসসান ইবনু সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন) আর যারা জুলুম করে তারা অচিরেই জানবে কী রূপ প্রত্যাবর্তনস্থলে তারা ফিরে যাবে।’ (আশ-শুআ’রা: ২২৪-২২৭)

মনে রাখতে হবে, কুরআন তথা ইসলাম কখনোই কাব্য ও শিল্পের বিরোধী নয়। তবে আধুনিকতার মোড়কে অশ্লীলতার ওপর ভিত্তি করে যে কাব্যচর্চা ও শিল্প গড়ে ওঠে, সেটি ইসলামের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়। যে চিন্তা, আবেগ ও উদ্যোগ-আয়োজন কেবলই মানুষকে বাস্তবতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রাখে, তা কখনো ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু কারো মন-মনন  ইসলামের আলোকে আলোকিত হয়ে উঠলে এবং ইসলামী ভাবধারায় কাব্য ও শিল্প  রচিত হলে তখন এই কাব্য-শিল্প প্রভূত কল্যাণ এবং আত্মিক সাফল্য বয়ে আনে। অর্থাৎ ইসলাম চায় না শিল্প-সাহিত্য কেবলই আবেগাপ্লুত রঙের ফানুস উড়িয়ে আত্মহারা হয়ে পড়ুক, বাস্তবতার পরিবর্তে কল্পনার জগৎ সৃষ্টি করে সত্যালোকিত জীবনকে এড়িয়ে  পশ্চাৎপদ অবস্থায় ফেলে রাখুক, এটা ইসলাম সমর্থন করে না। কোনো মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শ যদি ইসলাম হয়, তাহলে সে প্রতিটি বস্তুকেই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করবে এবং শিল্প ও সাহিত্যে তার প্রকাশও ঘটবে একই মূলনীতির ভিত্তিতে। আর এ-পর্যায়ের শিল্প ও সাহিত্যকে ইসলাম কখনো নিরুৎসাহিত করে না; বরং পবিত্র কুরআনে মানুষকে  প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং সৃষ্টিরহস্যের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করার প্রতি আকৃষ্ট করা হয়েছে। আর এসবই হ‌ওয়া উচিত শিল্প ও সাহিত্যের মূল উপাদান।

অবিশ্বাসীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতা করতে গিয়ে কুরআন মাজিদকে কাব্য বলে আখ্যায়িত করেছে; কিন্তু কুরআন হলো আসমানী ওহি, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বাণী। এ কথা যারা বোঝে না তারা আসলেই হতভাগা।

তবে আল কুরআন যেসব কবিকে অস্বীকার করে না, নিন্দা করে না তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো এভাবে বর্ণনা করেছে, ‘তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে।’ অর্থাৎ তাঁরা সাধারণ কবি-সাহিত্যিকদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাদের হৃদয় ঈমানে পরিপূর্ণ। এঁরা স্বভাব-চরিত্রে আদর্শবান। আর আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভার মাধ্যমে এঁরা কল্যাণকাজে অক্লান্ত  ও অগ্রগামী। তারা অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য। এরা নিজেদের আদর্শ ও বিশ্বাসকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে যারপরনাই সচেষ্ট ও বিপ্লবী। এরাই হচ্ছেন হাসসান বিন সাবিত, কা’ব ইবনে মালেক, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, আবদুল্লাহ ইবনে সিবআরি, আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেস রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ সাহাবা কবি। তাঁরা তাদের কাব্য-শিল্পে ইসলামের জয়গান গেয়েছেন। ইসলামের প্রাঙ্গণে চির ভাস্বর এসব কবি ও কবিতা। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমর্থনে কবিতা রচনা করেছেন এবং কাফের- মুশরিকদের বিরুদ্ধে কবিতা রচনা করেছেন।

উপরিউক্ত কবিদের মধ্যে শেষের দু’জন ইসলাম গ্রহণ করার আগে আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে কবিতা রচনা করতো; কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি প্রশংসাজ্ঞাপক কবিতা রচনা করেছেন।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসসান বিন সাবিতকে বলেন, তাদের (মুশরিকদের) বিরুদ্ধে কবিতা পাঠ করো, জিবরাঈল আ: তােমার সাথে রয়েছেন, অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, পবিত্র কুরআনে কবিদের সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুমিন বান্দা তার তলােয়ার ও ভাষার সাহায্যে জিহাদ করে। যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ নিয়ে বলছি, এর আঘাতও তােমাদের ছুড়ে মারা তীরের আঘাতের মতােই মারাত্মক হয়। (আহমাদ) এ ছাড়াও ইসলামী কাব্য ও শিল্প-সাহিত্যের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।

কথা হলো, জীবনের যেকোনাে দিককে কেন্দ্র করে ইসলামী ভাবধারা থেকে উৎসারিত যে কবিতা বা শিল্প-সাহিত্য রচিত হয় সেটিই হচ্ছে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশকারী শিল্প ও সাহিত্য।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসায় সিক্ত সাহাবি কবি হাসসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু লিখেছেন–

‘তোমার চোখের মতো ভালো চোখ পৃথিবীতে নেই,

এবং কোনো মাতা এমন সুন্দর পুত্র আর

প্রসব করেনি জানি বিশ্বে কোথাও।

তোমার সৃজন সে তো একেবারে দোষমুক্ত করে

এবং তুমিও তাই চেয়েছিলে আপন ইচ্ছায়;

তোমার তারিফ এই পৃথিবীতে বেড়েই চলেছে

যেমন কস্তুরী ঘ্রাণ বাতাসে কেবলি ছুটে চলে।

তোমার সৌভাগ্য, যার নেই কোনো সীমা-পরিসীমা

সমুদ্র-পানির মতো তোমার হাতের দয়ারাশি

এবং তোমার দান নদীর মতোন বেগে চলে।

আল্লাহ সহায় হোন হে রাসূল তোমার ওপরে

কেননা শত্রুরা জ্বলে সর্বক্ষণ তোমার ঈর্ষায়।’

তবে সত্য, সুন্দর ও পবিত্র জীবনের সন্ধানে যারা ব্যাপৃত তাদের সামনে সতত অজস্র সমস্যা ও সঙ্কটের পরীক্ষা চলতে থাকে। এর পাশাপাশি যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একান্ত ভালোবাসায় তাদের নিজের কাছে টেনে নেন। আল্লাহ জাল্লা শানুহু অন্তর্যামী; তাইতো তাঁর বান্দাদের মনের মণিকোঠায় লুকায়িত মর্মযাতনা-ব্যথা-বেদনা তিনি ভালোভাবেই জানেন। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাকে ভালোবাসেন তাকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন। যে ঈমানের পথে  অগ্রসর হতে থাকে রাহমানুর রাহিম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে সিরাতুল মুস্তাকিমে অটল অবিচল থাকতে সাহস ও শক্তি জোগান।

কুরআন মাজিদের আধ্যাত্মিক আলোয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জ্ঞানের পরিধি জ্যোতির্ময় ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত করেছেন। আর কুরআনুল কারিমের সেই নিয়ামত থেকে মুমিনরাও বঞ্চিত নয়। আহকামুল হাকিমিন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআন মাজিদে বলেন,

(হে মুহাম্মাদ,) আমি কি (জ্ঞান ধারণের) জন্য তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিইনি?

(হ্যাঁ, অতঃপর) আমিই তো তোমার (ওপর) থেকে তোমার বোঝা নামিয়ে দিয়েছি, (এমন এক বোঝা) যা তোমার পিঠ নুইয়ে দিচ্ছিল, আমিই তোমার স্মরণকে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছি, অতঃপর কষ্টের সাথে অবশ্যই আরাম রয়েছে; নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে আছে আরাম; অতঃপর যখনি তুমি অবসর পাবে তখনি তুমি (ইবাদতের) পরিশ্রমে লেগে যাও এবং সম্পূর্ণ নিজের মালিকের অভিমুখী হও । (আল-ইনশিরাহ : ১-৮)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা মুমিনদের অন্তরে অঙ্কিত করার চেষ্টা-প্রচেষ্টার একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে কবিতা ও শিল্প-সাহিত্য।

এ ব্যাপারে তথাকথিত সুশীল সমাজের কিছু অবিশ্বাসী-অপাঙ্ক্তেয় তাদের কূপমণ্ডূকতার কারণে দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও তাঁর রাসূলের চিরন্তন আলোকবর্তিকা এবং সরল পথের পথিকদের প্রতি বাঁকা চোখে তাকায়। কিন্তু এ কথা ধ্রুব সত্য যে, চাঁদের অনিন্দ্য সুন্দর জ্যোৎস্না কখনো কারো বক্র দৃষ্টির কারণে ম্লান হয়ে যায় না।

মহীয়ান গরিয়ান প্রতিপালক দয়াময় আল্লাহ তায়ালা বলেন, এ লোকেরা মুখের ফুৎকারেই আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়; অথচ তিনি তার এ নূর পরিপূর্ণ করে দিতে চান; তা কাফেরদের কাছে যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন। (আস-সফ : ৮)

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

এনএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222