আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দেওয়ালে তাজা রক্তের দাগ, রাজপথে উল্টে পড়ে থাকা পুলিশের নিরাপত্তা ব্যারিকেড, ভাঙা কাচ এবং রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত স্যান্ডেল। কোথাও রক্তভেজা স্কার্ফ, কোথাও বা চূর্ণ-বিচূর্ণ চশমা আর ছেঁড়া শার্ট—ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি জুড়ে সৃষ্টি হওয়া চরম বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও পুলিশি অ্যাকশনের ক্ষতচিহ্ন হিসেবে পড়ে রয়েছে এসব স্মৃতিমালা।
ভারতের প্রাণকেন্দ্র নয়া দিল্লির ঐতিহাসিক পার্লামেন্ট স্ট্রিট এবং ঔপনিবেশিক আমলের প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেস—সোমবারের নজিরবিহীন পুলিশি ক্র্যাকডাউনের বিভীষিকাময় চিহ্ন বহন করছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার আন্দোলনকারী, যাদের একটি সিংহভাগই সাধারণ শিক্ষার্থী, গত দিন স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন পুরো রাজধানী। আন্দোলনকারীদের একাংশ সুরক্ষাব্যূহ ভেদ করে পার্লামেন্টের একবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেও পরবর্তীতে পুলিশের ছোঁড়া একের পর এক টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই সহিংস হামলায় অন্তত ১০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন।
ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ১৮ বছর বয়সী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী অংশুল দেব বলেন, আমি এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে এটি দিল্লিতেই ঘটছে। আমাদের অভিভাবকরা যে সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছেন, তারা আজ আমাদের সাথে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের মতো ব্যবহার করছে। এটি আমাদের দেশ, এবং তাদের এই বিদ্বেষমূলক রাজনীতি থেকে আমরা দেশকে মুক্ত করবই।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতিতে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ভারতের উদীয়মান তরুণ সমাজ বা ‘জেন-জি’ (Gen Z) জনগোষ্ঠীর মধ্যে গত দুই মাস ধরে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। দেশের একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং ভুল গ্রেডিংয়ের শিকার হয়ে চরম হতাশায় অন্তত ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ মোদী সরকার এই বিষয়ে ক্রমাগত নীরবতা পালন করছে। সোমবার আন্দোলনকারীদের ঢল যখন সংসদের কাছে, ঠিক তখনই মোদীকে পার্লামেন্টে হাস্যোজ্জ্বল মুখে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতি গড়ায় মঙ্গলবার বিকেলে, যখন ভারতের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে অবস্থান গ্রহণ করেন। বিরোধী সংসদ সদস্যরা তার সাথে যোগ দিলে তাদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। এদিকে মানবাধিকার কর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার পর থেকে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মোদির সরাসরি পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মোদীর জীবনীকার নিলঞ্জন মুখোপাধ্যায় জানান, বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারীর উপস্থিতি প্রধানমন্ত্রী মোদীর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এখন পর্যন্ত মোদী আন্দোলনকারীদের কোনো ছাড় না দিয়ে নিজের অটল মানসিকতা জাহির করার কৌশলই বেছে নিয়েছেন। তিনি আরও যোগ করেন, নির্বাচনী ভোটব্যাংকে সরাসরি আঘাত না লাগা পর্যন্ত মোদী কোনো আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে বা দমন-পীড়নের পথ বেছে নিতে দ্বিধা করেন না। তরুণদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও সরকার তাদের কঠোর দমনের পুরনো পথেই হাঁটছে।
টিএইচএ/
