‘বিএনপি ক্ষমতায় এসে গণভোট-জুলাই সনদকে অস্বীকৃতি জানিয়েছে’

by Abid vs36

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এক দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আরেক দলের লুটপাট বা চাঁদাবাজির জন্য বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা রক্ত দেয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই ছিল রাষ্ট্রের খোলনলচে পরিবর্তন এবং সামগ্রিক সংস্কার। যদি আগের স্বৈরাচারী আমলের মতোই চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দখলদারি ও দুঃশাসন চলতে থাকে, তাহলে জুলাইয়ের সেই মহান আত্মত্যাগের মূল্য কোথায় থাকবে?

আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার তালতলা চত্বরে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ শেষে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন
banner

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এনসিপির মাসব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিকেলে সখীপুর পৌর শহরের পিচের মাথা এলাকা থেকে এই পদযাত্রা শুরু হয়। পদযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে তালতলা চত্বরে এসে এক পথসভায় মিলিত হয়। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা লক্ষ্য করছি বাংলাদেশকে আবারও একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। একটি ক্ষমতাসীন দল ভাবছে কেবল তারাই কথা বলবে, অন্য কোনো দলকে কথা বলতে দেওয়া হবে না। এমনকি সংসদেও আমাদের স্বাধীনভাবে কথা বলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা যখনই জনগণের অধিকার নিয়ে জনসভায় কথা বলতে যাচ্ছি, তখনই আমাদের ওপর ককটেল ও বোমা ফাটানো হচ্ছে।” তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “এই একদলীয় শাসন কায়েমের কথা যদি আবার কেউ মনে মনে ভাবে, তবে তাদের আওয়ামী লীগের সেই নির্মম পরিণতির কথা মাথায় রাখা উচিত। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৬ বছর একদলীয় দুঃশাসন চালিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে দিল্লিতে হেলিকপ্টার নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এখন তারা সেই নিষিদ্ধ ও অবৈধ টাকা ছড়িয়ে দেশে কয়েকটা ঝটিকা মিছিল করাচ্ছে এবং বাংলাদেশে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা করছে। সেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আমাদের সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কারের গণদাবির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, আপনারা জানেন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের সবার প্রধান দাবি ছিল সংস্কার। বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, দেশের সম্পদ লুটপাট করেছে, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম-খুন করেছে। তারা শাপলা চত্বরে গণহত্যা ঘটিয়েছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং সর্বশেষ জুলাই মাসে সাধারণ নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে। আমরা এমন একটা দেশ ও সরকার চেয়েছিলাম যেখানে মানুষের মত প্রকাশের এবং কথা বলার পূর্ণ অধিকার থাকবে। সেই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই ৩২টি দল মিলে দীর্ঘ ছয়-সাত মাস আলোচনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করেছিল। তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে এবং একই সাথে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট দিয়ে এই সংস্কার ও জুলাই সনদের পক্ষে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছিলেন।

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, “এই বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর খোলস পাল্টে সেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার এবং জুলাই সনদকে একপ্রকার অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা জনগণের সেই ঐতিহাসিক গণভোটের রায়কে অস্বীকার করছে এবং এখন পর্যন্ত প্রশাসন বা রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, সংস্কার হচ্ছে জনগণের ম্যান্ডেট। আমরা সংস্কার চেয়েছিলাম যাতে পুলিশের সংস্কার হয়, পুলিশ যাতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত না হয়; প্রশাসন যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়। মানুষ যাতে আদালতে গেলে প্রকৃত ন্যায়বিচার পায়। যদি জুলাই সনদ ও গণরায়ের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন না হয়, তবে দেশের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মাদক কারবার কোনো কিছুই বন্ধ হবে না।” তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণ ছাত্ররা নিজেদের জীবন বাজি রেখে নেমে এসেছিল চাকরির দাবিতে, কর্মসংস্থানের দাবিতে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করবে। কিন্তু ইতিমধ্যেই চার মাস পেরিয়ে গেলেও একটিও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। এমনকি তাদের দেওয়া নতুন বাজেটেও কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা কর্মপরিকল্পনা নেই।

আন্তর্জাতিক ইস্যু ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের দোহাই দিয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়াচ্ছে, অথচ সেই যুদ্ধ এখন শেষের পথে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও কমতির দিকে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো জ্বালানির দাম কমানো হয়নি, বরং রান্নার সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে এবং বিদ্যুতের দাম এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। এছাড়া সীমান্তে প্রতিনিয়ত আমাদের ভাই-বোনদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে এবং অবৈধ ‘পুশইন’ চলছে। অথচ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই সীমান্ত হত্যাকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করছেন এবং পুশইন বন্ধে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারছেন না। অতীতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের ওপর একটা বিশাল স্থায়ী বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ অজুহাতে ভারতীয় নাগরিকদের পুশইন করিয়ে বাংলাদেশের ওপর আরেকটা নতুন বোঝা চাপানোর যে পাঁয়তারা চলছে, তা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সরকারকে দৃঢ়তার সাথে ভারতের মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে হবে এবং এই অবৈধ পুশইন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক ফরিদ শিকদার ওরফে জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পথসভায় আরও বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দার এবং উপজেলার সদস্যসচিব মাওলানা আনসার আলীসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। পথসভায় বক্তারা জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় দেশের সাধারণ মানুষকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।

টিএইচএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222