কড়াকড়ি সত্ত্বেও থামেনি সীমান্ত হত্যা, ছয় মাসে নিহত ১০

by Abid vs36

বাংলাদেশ-ভারতের চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্তে কোনোভাবেই থামছে না ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মারণাস্ত্রের নির্মম ব্যবহার। বিভিন্ন সীমান্তে প্রায়শই পাখির মতো গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবেশী দেশটির এই আক্রমণাত্মক ও অনমনীয় মনোভাব একই রকম রয়ে গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সীমান্ত হত্যা ও ভারত থেকে অবৈধ ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে কড়া বার্তা এবং সীমান্তে সর্বোচ্চ নজরদারি জারি রেখেছে। বিজিবির পক্ষ থেকেও বিএসএফের চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। কিন্তু এই নানামুখী কড়াকড়ি সত্ত্বেও গত ছয় মাসে বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি। একই সাথে ভারতের পক্ষ থেকে ‘পুশ ইন’ বা পুশ ব্যাকের অপচেষ্টাও চলমান রয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

৬ মাসে নিহত ১০, ৭ জনই গুলিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গত ছয় মাসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সাতজন বিএসএফের সরাসরি গুলিতে এবং তিনজন পাশবিক শারীরিক নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। গুলিতে নিহতদের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগে তিনজন, রংপুরে দুজন এবং চট্টগ্রামে দুজন বিএসএফের বুলেটের শিকার হন। অন্যদিকে, নির্যাতনে নিহতদের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে দুজন এবং রংপুর বিভাগে একজন ছিলেন। একই সময়ে সীমান্ত সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন বাংলাদেশি। আসক জানিয়েছে, এসব হতাহতের ঘটনা মূলত খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা; সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও কোম্পানীগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ; রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায় ঘটেছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সীমান্ত সহিংসতায় বিএসএফের হাতে ৬ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
banner

বিগত বছরগুলোর তুলনায় হতাহতের চিত্র আসকের পরিসংখ্যান বলছে, বিগত বছরগুলোর একই সময়ের (জানুয়ারি-জুন) তুলনায় এবার হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। গত ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে ১৫ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৯ জন আহত হয়েছিলেন। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের একই সময়ে নিহত হন ১৪ জন। ২০২৩ সালেও প্রথমার্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১ জন। এছাড়া গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল ২০২০ সালে; সে বছর জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে নিহত হন। মূলত বাংলাদেশে গরুর খামার বৃদ্ধি পাওয়ায় গবাদিপশু চোরাচালান কমে আসা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে বিজিবির কড়া পাহারার কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে নিহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

কড়াকড়ি সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হওয়ার কারণ সীমান্তের এসব হত্যাকাণ্ডের কারণ ও গভীরতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, বিএসএফ প্রতিবারই সীমান্ত হত্যার পেছনে ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘চোরাচালানের’ অজুহাত সামনে আনে, যা সব ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। অনেকেই কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে নয়, বরং কাঁটাতারের ওপাড়ে থাকা আত্মীয়স্বজনদের দেখতে কিংবা এ পাড়ের গরু ওপাড়ে চলে গেলে তা আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলির মুখে পড়েন।”

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সীমান্তে ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে কড়াকড়ি বাড়লেও হত্যাকাণ্ড বন্ধের স্থায়ী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “চার হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্তের সব জায়গায় সমানভাবে নজরদারি করা অসম্ভব। দুই দেশের মানুষের বাড়ি বা জমির সীমানা এমনভাবে বিভক্ত যে কেউ কেউ দৈনন্দিন প্রয়োজনে বা চিকিৎসার জন্য সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে। বিএসএফ তাদের দেখামাত্রই ‘চোরাকারবারি’ আখ্যা দিয়ে গুলি চালায়।” নূর খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যদি কারও বিরুদ্ধে চোরাচালানের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকেও, তবে তাকে গুলি না করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আটক করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত বছরগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকার দাবি করা হলেও সীমান্তে রক্তপাত কখনো থামেনি। এটি স্পষ্ট করে যে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড আসলে কেবল দুই দেশের উপরিভাগের রাজনৈতিক সুসম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না, বরং ভারতের সীমান্ত নীতি ও বিএসএফের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে।

টিএইচএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222