ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিও ফুটেজে প্রকাশ্য দিবালোকে কিল-ঘুষি, লাথি ও পাথর দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করতে দেখা যায়, যা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে জাতিকে নাড়িয়ে দেয়।
গত ৯ জুলাই বিকেলে সোহাগকে পুরান ঢাকার রজনী বোস লেনের দোকান থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে মিটফোর্ডের ৩ নম্বর গেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শত মানুষের সামনে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির রমরমা ব্যবসা চলছিল। সোহাগ চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়।
পরদিন নিহতের বোন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় ১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৫–২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র্যাব। তাদের মধ্যে যুবদল নেতা মাহমুদুল হাসান ওরফে মহিন, তারেক রহমান রবিন, মনির, আলমগীর, টিটন গাজী, রাজিব ও সজিব অন্যতম। বেশ কয়েকজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
র্যাব ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যবসায়িক বিরোধের পাশাপাশি চাঁদাবাজি এ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ। র্যাবের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, “স্থানীয় চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অপরাধীদের পরিচয় নয়, অপরাধই মূল বিবেচ্য।”
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের ডিসি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও পূর্বশত্রুতা এ হত্যার পেছনে কাজ করেছে।”
ঘটনার পরপরই বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। এতে দলটি নিজেদের দায় এড়াতে চাইলেও বিরোধী দলীয় নেতারা বলছেন, “এই নৃশংস হত্যার পেছনে রাজনৈতিক সন্ত্রাসই দায়ী।”
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হবে। সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ মামলা পরিচালনা করবে।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজধানীজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। শাহবাগ, বাড্ডা, গুলশানসহ ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মশাল মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। ব্র্যাক, নর্থসাউথ, বুয়েট, জগন্নাথ, ইডেন কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের দাবি জানান।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের নেতৃত্বে বরিশালে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, “যারা মানুষকে পাথর মেরে মারে, চাপাতি চালায়, তাদের থামাতে হলে দেশে শরিয়া আইনের মাধ্যমে কিসাস ( হত্যার বদলে হত্যা) কার্যকর করতে হবে।”
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি—সবাই এই হত্যার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে।
অপরদিকে, নিহত সোহাগের পরিবার এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। স্ত্রী লাকি বেগম বলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে জানি না।” সন্তানরাও প্রশাসনের কাছে বিচার ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে একদিকে যেমন চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের নগ্ন রূপ উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ। এখন প্রশ্ন—এই হত্যার বিচার কতটা দ্রুত এবং কতটা দৃষ্টান্তমূলক হবে?
এনএ/
