ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে আবারও বাংলাদেশে রাশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘এসবার’ (Sberbank) ব্যাংকের শাখা চালুর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিগত চার-পাঁচ বছর আগে এই ব্যাংকের শাখা ঢাকায় খোলার সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলেও তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের প্রচ্ছন্ন চাপের কারণে তা থমকে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা-মস্কো দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা সচল করতে এই উদ্যোগ পুনরায় সচল করা হয়েছে। গত সপ্তাহে রাশিয়া সফরে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মস্কোতে এসবার ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
মস্কোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনের সরকারি সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এসবার ব্যাংকের প্রথম डिप्टी চেয়ারম্যান আলেকজান্ডার ভেদিয়াখিন এবং রাশিয়ার ফেডারেশন কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান কনস্টানটিন কোসাচভের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে ঢাকায় এসবার ব্যাংকের শাখা খোলার বিষয়ে রুশ পক্ষ নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। এই শাখাটি চালু হলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা ‘সুইফট’ (SWIFT)-এর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে সরাসরি রুবেল-টাকা কিংবা বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থ লেনদেন সহজ হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বর্তমানে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও খাদ্যশস্য আমদানি করতে আগ্রহী এবং রাশিয়াও রফতানিতে প্রস্তুত, কিন্তু প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে অর্থ পরিশোধের নিরাপদ মাধ্যম। ঢাকায় এসবার ব্যাংকের উপস্থিতি এই জটিলতার স্থায়ী সমাধান করবে এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনকেও গতিশীল করবে।
সফরকালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ক্রেমলিনের নীতি-নির্ধারকেরা ড. খলিলুর রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধ রফতানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া জ্বালানি সহযোগিতা, জনশক্তি রফতানি এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাশিয়ার জোরালো ভূমিকা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়া অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। এর আগে চীনের ব্যাংকের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন সহজ করার চেষ্টা হলেও তা সফল হয়নি। ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এই এসবার ব্যাংকের অগ্রগতির বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন, যা মূলত এক ধরনের ভূরাজনৈতিক চাপ ছিল। তবে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার স্বার্থেই এই বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে। এই সফর প্রমাণ করে যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একক কোনো জোটে না গিয়ে কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি সফলভাবে বজায় রাখছে।
টিএইচএ/
