‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর চূড়ান্ত প্রস্তাব প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একাধিক প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানিয়েছিল, কিন্তু তা কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিএনপি এটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত না হলে তারা সনদে স্বাক্ষর করবে না।
কমিশনের জমা দেওয়া চূড়ান্ত সুপারিশকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ইতিবাচকভাবে দেখলেও বিএনপি ও তাদের মিত্রদের অবস্থান ভিন্ন। ফলে ‘ঐকমত্য সনদ’ ঘিরে যে ঐক্যের কথা বলা হয়েছিল, তা এখন উল্টো অনৈক্যের দিকেই ইঙ্গিত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ শুধু সনদের ভবিষ্যৎ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
‘নোট অব ডিসেন্ট’ কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাবে দ্বিমত প্রকাশের আনুষ্ঠানিক উপায়। এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু মতামতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য উপাদান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিন্নমতের এই স্বীকৃতি দলগুলোর মধ্যে আস্থা গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যৎ সরকার ও সংসদে মতবিনিময়ের পরিসর উন্মুক্ত রাখে।
কিন্তু ২৮ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত সুপারিশে নোট অব ডিসেন্টের কোনো উল্লেখ না থাকায় বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তিনটি ধাপ থাকবে—অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশ, গণভোট এবং পরবর্তী সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন। তবে এসব প্রস্তাবে দলগুলোর ভিন্নমতের কোনো ইঙ্গিত রাখা হয়নি।
কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. রীয়াজ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো গণভোটে স্থান পাবে না। সাংবিধানিক বিষয়গুলো একত্রে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। এই অবস্থানেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিভাজন।
বিএনপি মনে করছে, তাদের লিখিত আপত্তি বাদ দেওয়া হয়েছে সচেতনভাবে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট লিপিবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি ছিল সনদে, কিন্তু তা বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতারণা করা হয়েছে।”
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, যিনি কমিশনের বৈঠকে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, বলেন, “ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে কমিশন এমন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে যা জাতিকে আরও বিভক্ত করবে।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ভিন্নমত পোষণ করেছে। তাদের মতে, সনদের ৮৪টি প্রস্তাব একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ হিসেবে গণভোটে যেতে হবে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটে জয়ী হলে পরবর্তী সংসদ ও সরকার তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত থাকলে ভিন্নমতের দলগুলোও সনদের মূল লক্ষ্য নিয়ে একমত হতে পারত। এতে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হতো। তারা মনে করেন, বিএনপির মতো বৃহৎ দলের আপত্তিকে উপেক্ষা করলে তা ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বড় শূন্যতা তৈরি করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, “ঐকমত্য কমিশনের উচিত ছিল সব পক্ষের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা। অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করলে এই বিতর্ক এড়ানো যেত।”
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমীন আল রশীদ বলেন, “জুলাই সনদ এখন ঐক্যের দলিল না হয়ে বিভেদের নতুন খসড়ায় পরিণত হচ্ছে। এতে জাতীয় ঐক্যের কথাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে—যেমন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—‘নোট অব ডিসেন্ট’ স্বীকৃত প্রথা হিসেবে বিদ্যমান। এতে কোনো প্রস্তাব বা আইনের বিরোধীরা তাদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডে রাখতে পারে, যা পরবর্তীতে সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি করে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই সনদ নিয়ে শুরু হয়েছে “হ্যাঁ–না” প্রচারণা। ৩০ অক্টোবর রাত থেকে রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠন ও সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফেসবুকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ লিখে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন। বিএনপিপন্থীরা ‘না’ লিখে পোস্ট দিচ্ছেন, আর জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীরা দিচ্ছেন ‘হ্যাঁ’। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অনলাইন প্রচারণা এখন ভার্চুয়াল ভোটযুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
সবশেষে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত—‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়া মানে ঐকমত্যের আবরণে অনৈক্যের বীজ রোপণ করা। ভিন্নমত স্বীকৃতি না পেলে রাজনৈতিক আস্থার সংকট আরও গভীর হবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অশুভ সংকেত।
হাআমা/
