জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের পর পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ চার কমিশনার একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। চিঠিতে সংসদে অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে উপস্থাপিত বক্তব্যকে ‘ভুল তথ্যভিত্তিক’ দাবি করে তারা নতুন সরকারের যুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রকাশিত ওই খোলা চিঠিতে বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিস স্বাক্ষর করেন।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশই ছিল মূল আইন (Principal Law)। এর ভিত্তিতেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছিল। ফলে এই তিনটি অধ্যাদেশ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
খোলা চিঠিতে বিদায়ী কমিশনাররা অভিযোগ করেন, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তারা বলেন, সংসদে দাবি করা হয়েছে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর, কিন্তু বাস্তবে গুম অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান ছিল।
এছাড়া সংসদে বলা হয়েছে অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা নেই এবং জরিমানা আদায়ের উপায় উল্লেখ নেই—এ দাবিকেও তারা নাকচ করেন। তাদের দাবি, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণসহ জরিমানা আদায় ও পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ ছিল। এমনকি সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দিলে গুম অধ্যাদেশে শাস্তির বিধানও ছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন যথেষ্ট, সংসদে এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে চিঠিতে বলা হয়, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে, সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। তাই বিচ্ছিন্ন গুমের বিচার আইসিটি আইনের আওতায় সম্ভব নয়। তারা দাবি করেন, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় এখন থেকে নতুন গুম হলে সেটি ফৌজদারি আইনেও সংজ্ঞায়িত থাকবে না এবং ভুক্তভোগীরা প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে কমিশনাররা বলেন, কোন মৃত্যু রাজনৈতিক প্রতিরোধের কারণে ঘটেছে আর কোনটি বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড—তা নির্ধারণে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের পুনর্বহাল হওয়া আইনে কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে পারে না। ফলে ভবিষ্যতে জুলাই যোদ্ধারাও মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সংসদে বলা হয়েছে কমিশন তদন্ত করে নিজেই বাদী হয়ে মামলা করলে তা পক্ষপাতমূলক হবে। কিন্তু তাদের মতে, কমিশন বিচারকের ভূমিকা পালন করবে না। তাই এটিকে পক্ষপাত বলা যৌক্তিক নয়। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, পুলিশও নিয়মিতভাবে তদন্ত শেষে বাদী হয়ে মামলা করে থাকে।
২০০৯ সালের আইন ও ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ সমান শক্তিশালী—সংসদে এমন বক্তব্যের জবাবে বিদায়ী কমিশনাররা বলেন, ২০০৯ আইনে কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা ছিল না। অথচ ২০২৫ অধ্যাদেশে কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
খোলা চিঠিতে বিদায়ী সদস্যরা অভিযোগ করেন, সরকারের প্রকৃত আপত্তির মূল লক্ষ্য ছিল মানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করা। তারা বলেন, কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা এবং কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিঠির শেষাংশে তারা বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় আছে এবং তাদের প্রশ্ন—“এখন আমাদের কী হবে?” এই প্রশ্নের জবাব শুধু আশ্বাস দিয়ে নয়, বরং কার্যকর ও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। এতে অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনরায় কার্যকর হয়।
হাআমা/
