ইসলামাবাদের রাস্তায় চলছে মেরামত ও পাথর বাঁধানোর কাজ। রাজধানীজুড়ে জোরদার করা হচ্ছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একইসঙ্গে প্রত্যাশা ও উদ্বেগের আবহ তৈরি হয়েছে পাকিস্তানে, কারণ এই সপ্তাহান্তে বিশ্বের নজর থাকবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
ঠিক ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। ওই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর একাধিক দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শীর্ষ মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং লেবাননে ইসরাইলের ব্যাপক হামলার কারণে সেই যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যে চাপের মুখে পড়েছে।
কখন ও কোথায় হবে আলোচনা?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয় পক্ষকে সংঘাত পুরোপুরি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আলোচনার আমন্ত্রণ জানানোর পর ইসলামাবাদে এই আলোচনা আয়োজন করা হয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার সকালেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বলেছে, আলোচনা ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। অর্থাৎ প্রতিনিধি দলের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ইসলামাবাদে অবস্থান করতে পারে কিংবা পরবর্তী রাউন্ডে ফেরার সম্ভাবনাও রয়েছে।
আলোচনার প্রধান ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদের রেড জোনে অবস্থিত সেরেনা হোটেলকে নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত পুরো হোটেলটি বুকিং নিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং হোটেলের অন্যান্য অতিথিদের স্থানান্তরিত হতে বলা হয়েছে।
এদিকে নিরাপত্তা জোরদারে পাকিস্তান সরকার ৯ ও ১০ এপ্রিল রাজধানীতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং রেড জোন কার্যত সিল করে দেওয়া হয়েছে।
কারা কারা আসছেন?
হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
অন্যদিকে ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির কোনো প্রতিনিধি বৈঠকে থাকবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, গালিবাফ নিজেই আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার।
ইরানের রাষ্ট্রদূত এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে জানান, প্রতিনিধি দল ৯ এপ্রিল পৌঁছাবে। তবে কিছু সময়ের মধ্যেই পোস্টটি মুছে ফেলা হয়।
আলোচনা কীভাবে হবে?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা আয়োজন করবেন। তিনি শুক্রবার (১০ এপ্রিল) অথবা শনিবার সকালে উভয় পক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে প্রাথমিক বৈঠক করতে পারেন। আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার।
শনিবার মূল আলোচনায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধি দল আলাদা কক্ষে থাকবেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে আলোচনা এগিয়ে নেবেন।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সন্দিহান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মাস্কাট ও জেনেভায় আলোচনা চলার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা শুরু করে বলে অভিযোগ তাদের।
তবে ইরান মনে করছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স সংঘাত নিরসনে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর
আলোচনাটি কাভার করতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অন্তত তিন ডজন ভিসা আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০ জন সাংবাদিকের ভিসা অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন নিরাপত্তা দল ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কেন পাকিস্তান?
সম্প্রতি পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে বসবাস করে, যা তেহরানের কাছে দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, ফলে ইরানের কাছে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান ২০০৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালি’ হিসেবে স্বীকৃত, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতারও ইঙ্গিত দেয়।
আলোচনার মূল ইস্যু কী?
প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পক্ষের অবস্থান এখনও অনেক দূরে। ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবে রয়েছে—হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তত্ত্বাবধান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব শর্তে সম্মতি দেয়নি। তবে ট্রাম্প ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনাকে ‘কার্যকর’ বলে উল্লেখ করেছেন।
হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছাড়তে রাজি হয়েছে, যদিও ইরান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
লেবানন নিয়ে নতুন সংকট
আলোচনার বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে লেবানন পরিস্থিতি। বুধবার লেবাননে ইসরাইলের হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইলি হামলা চলতে থাকলে তেহরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত লেবাননের পরিস্থিতিকে অন্তর্ভুক্ত করে না। হোয়াইট হাউসও একই অবস্থান নিয়েছে।
ফলাফল কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষের গভীর অবিশ্বাসের কারণে স্বল্প সময়ে চূড়ান্ত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম। লেবানন পরিস্থিতি বড় ধরনের ফাটল তৈরি করছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ বলেছেন, আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশ বিষিয়ে উঠেছে এবং ইসরাইল প্রক্রিয়াটি ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষক সাহার খান বলেন, “অবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় বাধা। তবে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলে এবং তারা সত্যিই আলোচনায় বসতে পারলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি।”
এদিকে গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফার মনে করেন, আলোচনায় ইসরাইলের অনুপস্থিতি একটি বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। কারণ যুদ্ধের অন্যতম পক্ষ হয়েও ইসরাইল আলোচনায় নেই, অথচ সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থ সবচেয়ে বেশি তাদেরই।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘ সংঘাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় উভয় পক্ষই ধীরে ধীরে অবস্থান নরম করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।- তথ্য: আল-জাজিরা
হাআমা/
