দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে মহিলা মাদরাসাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম, কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা পুরো আলেম সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গুটিকয়েক ব্যক্তির অনৈতিকতা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই পবিত্র অঙ্গনগুলো কলঙ্কিত হতে পারে না। তাই সাধারণ আলেম সমাজ অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করছে:
১. অনুমোদন ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা
যত্রতত্র অননুমোদিত মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা বন্ধ করতে হবে। যারা নতুন মাদরাসা করতে চান, তাদের স্বীকৃত কোনো শিক্ষাবোর্ড (যেমন: বেফাক বা আঞ্চলিক বোর্ড) থেকে প্রাক-অনুমোদন নিতে হবে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তদারকির অধিকার থাকতে হবে, যাতে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে বা খেয়ালখুশিমতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে না পারে।
২. শক্তিশালী পরিচালনা কমিটি গঠন
প্রতিটি মহিলা মাদরাসায় (তা ভাড়া বাড়িতে হোক বা নিজস্ব জায়গায়) একটি শক্তিশালী পরিচালনা কমিটি থাকতে হবে। এই কমিটিতে স্থানীয় বিজ্ঞ আলেম, দ্বীনদার শিক্ষিত ব্যক্তি এবং সচেতন অভিভাবকদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। পরিচালক একক সিদ্ধান্তে সব পরিচালনা করবেন, এই প্রথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
৩. আবাসিক ব্যবস্থার কঠোর নীতিমালা
ভাড়া করা সংকীর্ণ বাড়িতে আবাসিক মহিলা মাদরাসা পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপদ পরিবেশ ও প্রশস্ত জায়গা না থাকলে আবাসিকের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। অনাবাসিক মাদরাসাকে উৎসাহিত করতে হবে এবং আবাসিক ছাত্রীদের ক্ষেত্রে নারী পরিদর্শক ও নেগরানির মাধ্যমে তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বোর্ডভিত্তিক তদারকি ও অভিযোগ সেল
শিক্ষাবোর্ডগুলোতে ‘মহিলা মাদরাসা অনুবিভাগ’ নামে স্বতন্ত্র বিভাগ থাকতে হবে। নারী শিক্ষক বা ছাত্রীরা যাতে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারে, সেজন্য ডেডিকেটেড হটলাইন চালু করতে হবে। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
৫. শিক্ষক নিবন্ধন ও ব্ল্যাকলিস্ট পদ্ধতির প্রচলন
সকল শিক্ষক-শিক্ষিকার কেন্দ্রীয় নিবন্ধন থাকতে হবে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন ও চারিত্রিক বিচ্যুতি প্রমাণিত হলে তার নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। তাকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে, যাতে তিনি দেশের আর কোনো মাদরাসায় শিক্ষকতার সুযোগ না পান।
৬. পরিচালকের দায়বদ্ধতা ও কঠোর শাস্তি
কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বা তার প্রশ্রয়ে কোনো অপরাধ ঘটলে তাকে আজীবনের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করতে হবে। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ‘আড়ালে আপস’ করা যাবে না; বরং অভিযুক্তকে রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৭. সিলেবাসে ব্যবহারিক শিক্ষার সংযোজন
নারীদের জন্য উপযোগী দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি সিলেবাসে গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, আত্মরক্ষা এবং হস্তশিল্পের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার ও সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে।
৮. জবাবদিহিতা ও অডিট ব্যবস্থা
প্রতিটি মাদরাসার আয়-ব্যয় এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বার্ষিক অডিট ও প্রতিবেদন বোর্ডে জমা দিতে হবে। উস্তাদদের ব্যক্তিগত আচরণের ওপর নজর রাখার জন্য অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত জ্যেষ্ঠ আলেমদের সমন্বয়ে একটি ‘গোপন তদারকি টিম’ গঠন করা যেতে পারে।
৯. অভিভাবকদের সচেতনতা
সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করেই অভিভাবকদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ছাত্রীদের মতিগতি লক্ষ্য করা এবং নিয়মিত মাদরাসার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আবাসিকে না রাখাই শ্রেয়।
১০. আলেম সমাজের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
অপরাধী যে-ই হোক, দাড়ি-টুপি কিংবা বড় আলিমের দোহাই দিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাকওয়ার পাশাপাশি শাস্তির ভয়ও থাকতে হবে। আলেম সমাজকেই প্রথম সোচ্চার হতে হবে যাতে কোনো পাপিষ্ঠ ব্যক্তির কারণে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা বা আলেম সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়।
আমরা যদি নিজেরা নিজেদের ঘর সংশোধন না করি, তাহলে বিজাতীয় শক্তি ও রাষ্ট্র এমন কোনো আইন চাপিয়ে দিতে পারে, যা আমাদের দ্বীনি শিক্ষার পথকে সংকুচিত করবে। সুতরাং সময় থাকতেই মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও মাদরাসার বোর্ডগুলোকে কঠোর ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হাআমা/
