সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনা, উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদীয় দল। বৈঠকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি দমন ও আসন্ন বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্যদের একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (৬ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এই গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া এই বৈঠক প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে এবং শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে। সভাটি পরিচালনা করেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে চিফ হুইপ জানান, সভায় সরকারের গত ১২০ দিনের কাজের অগ্রগতি উপস্থাপন করা হয় এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের সার্বিক মূল্যায়ন করা হয়েছে।
শিক্ষা সংস্কার ও মিড-ডে মিল চালুর নির্দেশ: চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, যা শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাক্রম সংস্কারের পাশাপাশি দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত ‘মিড-ডে মিল’ (দুপুরের খাবার) চালুর জোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যখাতে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল: সভায় দেশের চলমান ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জনগণের জন্য উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে চীনের সহযোগিতায় দেশে এক হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষরের তথ্য সভায় তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে অন্তত একটি হাসপাতাল সম্পূর্ণভাবে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতে পারেন। দীপেন দেওয়ান মূলত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন বলে সরকারকে অবহিত করেছেন।
জ্বালানিতে লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি ও আসন্ন বাজেট: জনগণের কল্যাণ ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে চিফ হুইপ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি খাতে সরকারকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। শুধু তেল আমদানির জন্যই সরকারকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এছাড়া আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। চিফ হুইপ জানান, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হবে। এরপর ১৫ জুন সম্পূরক বাজেট পাসের পর ১৬ জুন থেকে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হবে। আলোচনা ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজন হলে সেদিন থেকে সংসদের সকাল ও বিকেলের পৃথক দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে পারে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যেই বাজেট পাস করা হবে।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি: দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে বৈঠকে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চিফ হুইপ বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল আর্থিক ঘাটতি নিয়ে আমাদের সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কারণে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চুরি-দুর্নীতি বন্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে জনসেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে চাঁদাবাজি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে চলমান কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কূটনৈতিক সাফল্য ও এমপিদের দায়িত্ব: বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মর্যাদাপূর্ণ পদে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়ার ঐতিহাসিক বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আসে। চিফ হুইপ একে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বড় কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি, নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে এবং স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য দেশের সকল সংসদ সদস্যদের কঠোর নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
টিএইচএ/
