ভারতে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে অশ্লীল ছবি তৈরির হিড়িক, বিপন্ন নিরাপত্তা

by Abid vs36

ভারতে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির অপব্যবহার এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এআই ব্যবহার করে নারীদের আপত্তিকর ও যৌনতাবাদী ছবি, ডিপফেক ভিডিও এবং ভিউ প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর নতুন বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক গবেষকদের মতে, এই ধরনের সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে মূলত ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নারীদের টার্গেট করে অনলাইনে হেনস্থা করা হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের বাস্তব জীবনেও গভীর নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে।

কাশ্মীরের বাসিন্দা এবং নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্স মডেল সামরীন আইয়ুব এমনই এক সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ২৪ বছর বয়সী এই তরুণী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুট করেই তিনি নিজের জীবনের ওপর তৈরি একটি ভিউ ও বানোয়াট ভিডিও দেখতে পান, যা ইনস্টাগ্রামে দ্রুত ভাইরাল হচ্ছিল। পেশাদার টেলিভিশন সংবাদের মতো তৈরি সেই ভিডিওতে এআই ভয়েসওভার বা কৃত্রিম কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে তার চরিত্র হনন করা হয়। এমনকি সেই ভিডিওতে ক্যাম্পাস জীবনের সাধারণ সব ছবি জুড়ে দিয়ে তার আপন ভাইকেই তার দালাল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটি এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে সাধারণ মানুষের পক্ষে একে ভিউ বলে চেনা অসম্ভব ছিল। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামরীনকে তীব্র মানসিক ট্রমা, হুমকি এবং সামাজিক হেনস্থার মুখোমুখি হতে হয়, যার ফলে তার মডেলিং পেশাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। তিনি নয়াদিল্লির সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিজ্ঞাপন
banner

ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ) ২০২৩ সালের মে থেকে গত বছরের মে মাস পর্যন্ত এক্স, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে ১,৩২৬টি এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা এই ধরনের যৌনতাবাদী কনটেন্টগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব কনটেন্টে ৬৭ লাখেরও বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে। সিএসওএইচের ডিজিটাল গবেষণা বিশ্লেষক জেনিথ খান জানান, জেনারেটিভ এআই এখন কোনো খরচ ছাড়াই এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মানুষের কুৎসিত কল্পনাকে বাস্তবসম্মত ছবিতে রূপান্তর করতে পারছে। গবেষকেরা এই ছবিগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ ধারা লক্ষ্য করেছেন, যেখানে একজন ‘মুসলিম দেখতে নারী’কে একজন হিন্দু দেখতে পুরুষ’-এর সঙ্গে আপত্তিকরভাবে দেখানো হয়, যা মূলত সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের এক নোংরা মানসিকতা। মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এই ঘটনাকে নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চালানো বৃহত্তর রাজনৈতিক অশ্লীলতার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মুম্বাই ভিত্তিক অনলাইন সেফটি হেল্পলাইন ‘মেরি ট্রাস্টলাইন’ এর প্রতিবেদনেও এই উদ্বেগের সত্যতা মিলেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে এই হেল্পলাইনটি ৪৮২টিরও বেশি সাইবার অপরাধের মামলা পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই ছিল এআই বা ডিজিটাল মাধ্যমে বিকৃত করা কনটেন্ট সম্পর্কিত। লোকলজ্জা, ভয় এবং পারিবারিক ট্রমার কারণে ভুক্তভোগী নারীরা অধিকাংশ সময়ই এই বিষয়ে মুখ খুলতে পারেন না। এর আগে ‘সুলি ডিলস’ এবং ‘বুলি বাই’ নামক অনলাইন নিলাম প্ল্যাটফর্মেও মুসলিম নারীদের ছবি ব্যবহার করে তাদের অবমাননা করা হয়েছিল। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও আইনজীবী অপার গুপ্তা বলেন, ছবি বা ভিডিওটি কৃত্রিম হলেও এর সামাজিক ক্ষতি অত্যন্ত বাস্তব। ভারতের বর্তমান আইন এই দ্রুতগতির প্রযুক্তিগত অপরাধের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। প্ল্যাটফর্মের নকশা ও আইনি কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন না এলে এআই-নির্ভর এই মারাত্মক হয়রানি প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

টিএইচএ/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222